মৃত আয়লান ও সাম্রাজ্যবাদীদের রাজনীতি

সম্পাদকীয়: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১০:৪১ অপরাহ্ন
aylan_postcard

সমুদ্রের পাড়ে ছোট্ট ছেলে আয়লানের উল্টে পরে থাকা মৃতদেহ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সাথে সাথে আমাদের সামনে একটি প্রশ্নও উত্থাপন করেছে, তাহলো আমাদের এই বিশ্ব কি ঠিকঠাক ভাবে চলছে? কি এমন সংকট যে এক নিষ্পাপ শিশুকে মুখথুবরে বালির মধ্যে লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হয়?

সংকট আছে, এবং এই সংকটের স্বরূপ নির্ণয় করাও জরুরি। আয়লানের ঘটনার পর সবাই যে যার মতো করে সংকটের ব্যাখ্যা দিচ্ছে এবং অধিকাংশক্ষেত্রেই এই ব্যাখ্যা ভুলে ভরা। অনেকেই এই ঘটনার মূল অভিযুক্তদের দায় মুক্তি দিয়ে তাদের উদারতার প্রশংসায় ব্যস্ত। যখন লাখ লাখ শরণার্থী সারি বেঁধে ইউরোপে প্রবেশ করছে আর তাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে সেসব দেশের অধিবাসীরা তখন আমাদের ভুলে গেলে চলবে না এই সংকটের জন্য দায়ী মূলত এই দেশগুলোই। তাই পশ্চিমাদের এই ধরনের সাময়িক উদারতায় মুগ্ধ না হয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত কিভাবে এই দেশগুলো থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়।

আয়লানের ঘটনার পর অনেকেই বলছে, দেখো সিরিয়ার ঘটনায় মুসলিম দেশ বিশেষ করে সৌদি আরব কোন সাহায্য করছে না, অথচ ইউরোপের দেশগুলো ঠিকই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের চিন্তাগুলোও ভুল, এই ধরনের কথার মধ্যে দিয়ে সৌদিআরব ও পশ্চিমাবিশ্বকে বিপরীত পক্ষে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যদিও প্রকৃতপক্ষে সৌদি আরব তার মিত্র পশ্চিমাদের স্বার্থই রক্ষা করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে।

শরণার্থী সংকটের মূলে আছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের দখলদারিত্বের রাজনীতি। এই দখলদারিত্ব কায়েম করতে যেয়েই লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। যদিও পশ্চিমারা বুলি আওরাচ্ছে যে সিরিয়া বা লিবিয়াতে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য অভিযান চলছে, কিন্তু এটা আমাদের মনে রাখতে হবে এই দেশগুলোতে স্বৈরশাসক থাকলেও দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান এতোটা করুণ ছিলোনা। অন্তত তখন তাদের জীবন নিয়ে এখান থেকে ওখানে পালিয়ে বেড়াতে হতো না। তাই যতই গণতন্ত্রের কথা বলা হোক না কেন, এই মানবিক বিপর্যয়ের ভার তাদেরকেই নিতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের উপর কব্জা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয়মিত্ররা তৎপর। সেই ধারাবাহিকতায়ই দখল হয়েছে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার মতো তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো। সৃষ্টি হয়েছে  ভয়াবহ মানবিক সংকট। অথচ আজ দখলদারেরা এই সংকটের দায় নিতে নারাজ। জার্মানীর মতো দেশ কিছু শরণার্থীকে আশ্রয় দিলেও প্রথম সারির দখলদার ব্রিটেন শরণার্থীদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। হাঙ্গেরি, অষ্ট্রিয়ার মতো দেশগুলো তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বসে রয়েছে তীর্থের কাকের মতোন। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড ধরা, তাতে লেখা, 'নো ফুড, নো ওয়াটার'। বিশ্ব মোড়লেরা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দরকষাকষি করছে, তখন সন্তানের মুখে একফোঁটা পানি দেওয়ার জন্য অসহায় পিতা প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছে।

আমাদের বুঝতে হবে এই সংকটের মূলে আছে তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত পুঁজিবাদী বিশ্ব। যার চূড়ান্ত ধাপ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। আজ এই সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়েই পুরো বিশ্বে চলছে যুদ্ধের দামামা। মৃতপ্রায় পুঁজিবাদ নিজেকে রক্ষা করতে জড়িয়ে পড়ছে একের পর এক যুদ্ধে। যার থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপক্ষে শক্তিশালী জোট গড়ে তোলা, ভেঙ্গে ফেলা পুঁজিবাদের শিকল।