রানা প্লাজা হত্যাকান্ড: এখনও শুকোয়নি শ্রমিকের রক্ত

সম্পাদকীয়: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৫, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন
_postcard

লাখো শ্রমিক নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শরীরের রক্তকে পানি করে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এই সমাজ ও সভ্যতা। সভ্যতার চাকাকে ঘুরাচ্ছে এই খেটে খাওয়া মজদুররাই। অথচ তাতেও থামে না পুঁজির আগ্রাসন। তার চাই আরো, আরো বেশি মুনাফা। চাই আরো শ্রমিকের রক্ত, শ্রমিকের রক্তের উপরই গড়ে উঠে পুঁজির দালালদের অর্থের সাম্রাজ্য। এই রাষ্ট্র, এই সমাজ আজ অর্থলোভী, লুটেরা, জচ্চোর মুনাফাবাজদের দাস। যার প্রমাণ রানা প্লাজার হত্যাকান্ড। একদিনে একহাজার মানুষের দালানের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ প্রমান করে এই রাষ্ট্রে শ্রমিক ও মজদুরদের জন্য বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকারটুকুও অবশিষ্ট নেই।

রানাপ্লাজার ঘটনাটিকে নিছক একটি দুর্ঘটনা বলার কোন অবকাশ নেই। এই ঘটনা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই অংশ। তার আগেও এই ধরনের ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগেই ঘটেছে তাজরিন হত্যাকান্ড। কয়েকশ শ্রমিক পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অথচ মূলগেট তালা বদ্ধ থাকায় কেও বেরোতে পারেনি। তাজরীন হত্যাকান্ডেও কারও বিচার হয়নি।

এই ঘটনা গুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় আমাদের দেশে শ্রমিকদের কিভাবে অত্যাচার করা হয়। যেনো ওরা স্বাধীন মানুষই না, ওরা হচ্ছে কৃতদাস। সকালবেলা দল বেধে তাদের খাঁচায় ঢুকিয়ে তালা মেরে দাও। তারপর সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। কোন শ্রমিক কতবার টয়লেটে যায় তারও হিসেব রাখে মালিকের লাঠিয়াল। সাথে নারী শ্রমিকদের উপরি পাওনা হিসেবে মেলে যৌন নির্যাতন।

আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদরা গার্মেন্টেস সেক্টরের উন্নতির সম্ভাবনার কথা বলায় সময় প্রায়ই বলেন, আমাদের সম্ভাবনা প্রচুর কারন আমাদের দেশে শ্রম সস্তা। সহজ ভাষায় আমাদের দেশে শ্রমিককে তার প্রাপ্য মজুরি দেওয়া হয় না এই কথাটিতে ওনারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করেন। অর্থ্যাৎ গোড়াতেই গলদ। শ্রমিককে তার প্রাপ্য মজুরিই দেওয়া হয় না, আর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, চিকিৎসা সেবা, ঝুকি ভাতা এসবতো বহু দূরের ব্যাপার।

শ্রমিকদের নিয়ে আমাদের শিক্ষিত সুশীল সমাজেরও নাক উঁচু ভাব প্রবল। শ্রমিকরা নায্য মজুরির দাবিতে রাস্তায় নেমে এলে সুশীলদের কাছে মনে হয় ওরা কত বর্বর। শ্রমিকদের আন্দোলনকে ওনারা দেখেন দেশের উন্নয়নের পথে বাধা স্বরুপ। দেশের উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেই উন্নয়নের ফল ভোগ করে কারা সেটাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।

রানা প্লাজার ঘটনার পর কতগুলো বিষয় সামনে উঠে আসে যাতে প্রমাণ হয় এদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তার কথা মালিক পক্ষ কখনও ভাবে না। এই ভবনটির নকশা ছিলো ত্রুটিপূর্ন। তারপর উদ্ধার কাজ চালানোর সময় দেখা যায় উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিস টিমের কাছে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই। এমন কি অক্সিজেনের সিলিন্ডার, টর্চলাইট, হাতুড়ি ইত্যাদি জরুরি জিনিসের জন্যও সাধারণ মানুষের কাছে আহবান জানানো হচ্ছিলো। অর্থ্যাৎ শ্রমিকদের নিরাপত্তার দেওয়ার জন্য নূন্যতম প্রস্তুতি নেই এই রাষ্ট্রের।

আহত শ্রমিকদের উদ্ধারের পর তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ এই ঘটনার দুবছর কেটে গেলো এখনও অধিকাংশ শ্রমিক কোন সাহায্য পায়নি। পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে অনেকে। অব্যবহৃত হয়ে পরে আছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের ১০৮ কোটি টাকা।

অপরদিকে আমরা দেখতে পাই এই ঘটনার সময় আহতদের চিকিৎসা দেওয়া ‘এনাম মেডিকেল কলেজের’ প্রতিষ্ঠাতা ডা: এনাম হিরো বনে যান। রানা প্লাজার আবেগকে পুঁজি করে তিনি নির্বাচন করে সংসদ সদস্যও হয়ে যান । শুধু হয় না শ্রমিকদের কিছু। তারা এখনও রানা প্লাজার ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে।

রানা প্লাজার ক্ষত এখনও শুকোয়নি। শুকোবে না যতদিন পর্যন্ত না এই শ্রমিক হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছে। এই রাষ্ট্র সেদিনই গণমানুষের রাষ্ট্র হবে যেদিন থেকে তা হবে শ্রমিকের রাষ্ট্র। লুটেরা মুনাফাখোরদের হাত থেকে এই রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য দরকার শ্রমিক, কৃষক ও জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম