কার্ল মার্কসঃ নতুন সমাজের স্রষ্টা – সর্বহারাশ্রেণীর ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক তত্ত্বের রূপকার

সাক্ষাৎকার: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ০৫ মে ২০১৫, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন
karl-marx

  পঞ্চাশের দশকের শেষ ও ষাটের দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবনে মার্কস ফিরে আসেন রাজনৈতিক সক্রিয়তায়। ১৮৬৪ সালে (২৮শে সেপ্টেম্বর) ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি’ – সুপ্রসিদ্ধ প্রথম আন্তর্জাতিক – প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডনে। মার্কস ছিলেন এই সংগঠনের প্রাণ-স্বরুপ, শ্রমিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করতে গিয়ে, বিভিন্ন রুপের অ-সর্বহারা প্রাক মার্কসীয় সমাজতন্ত্রবাদকে (মাজ্জীনি, প্রুধোঁ, বাকুনিন, ব্রিটেনের উদারনৈতিক ট্রেড-ইউনিয়নবাদ, জার্মানীর দক্ষিণ-ঝোঁকী লাসালীয় দোদুল্যমানতা ইত্যাদি) যৌথ কর্মকান্ডের ধারায় প্রবাহিত করার প্রয়াস চালাতে গিয়ে এবং এসব সকল গোষ্ঠি ও দলের বিভিন্ন তত্ত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে গিয়ে, মার্কস কঠোর প্রচেষ্ঠা গড়ে তোলেন বিভিন্ন দেশের শ্রমিকশ্রেণীর সর্বহারা সংগ্রামের সমরূপী-বৈশিষ্ট্যের রণকৌশল। যে ‘প্যারি কমিউনের’ এতো সুগভীর, সুস্পষ্ট, চমৎকার, কার্যকর ও বৈপ্লবিক এক বিশ্লেষণ মার্কস উপস্থিত করেছিলেন (ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ, ১৮৭১), সেই প্যারি কমিউনের (১৮৭১) পতনের পর এবং ‘আন্তর্জাতিকে’ বাকুনিন-পন্থীদের কারণে সৃষ্ট ফাটলের পর, এই সংগঠনটি আর ইউরোপে টিকে থাকতে পারল না। ‘আন্তর্জাতিকের’ ‘সাধারণ পরিষদ’ নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল, এবং বিশ্বের সকল দেশেই শ্রমিক আন্দোলনের আরো বৃহত্তর বিকাশের এক কালপর্বের জন্যে তৎকালে পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যে কালপর্বে ব্যাপ্তির দিক দিয়ে আন্দোলন বেড়ে উঠেছিল, আর স্বতন্ত্র জাতীয় রাষ্ট্রসমূহে গণ-আকৃতির সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক পার্টিগুলো গড়ে উঠেছিল।
  ‘আন্তর্জাতিকের’ কঠোর শ্রমসাধ্য কর্মকান্ড এবং অধিকন্তু তত্ত্বগত কাজে তার চেয়েও অধিক কঠিন পরিশ্রমের কারণে মার্কসের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। নিরবিচ্ছন্ন ভাবেই তিনি কাজ করে চললেন রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে এবং পুঁজি গ্রন্থটিকে সম্পূর্ণ করার জন্য, যে গ্রন্থটির জন্যে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন রাশি রাশি নতুন মাল-মশলা এবং আয়ত্ত করে ছিলেন অনেকগুলো ভাষা (দৃষ্টান্ত স্বরুপ রুশ ভাষা)। কিন্তু, ভগ্ন-স্বাস্থ্য তাঁকে বাধ সাধলো পুঁজি গ্রন্থটি সমাপ্ত করতে।
 
প্রসঙ্গত এটুকু উল্লেখ করা খুবই প্রয়োজন যে ১৮৪৭ সালের বসন্তকালে কমিউনিস্টলীগ নামে অভিহিত এক গুপ্ত প্রচার সমিতিতে মার্কস ও এঙ্গেলস যোগ দেন; লীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে (লন্ডন, নভেম্বর ১৮৪৭) তাঁরা বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেন, যে কংগ্রেসের অনুরোধেই তাঁরা রচনা করেন সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’, ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে যা প্রকাশিত হয় । প্রতিভা সঞ্জাত স্পষ্টতা ও চমৎকারিত্ব সহকারে এই রচনাটিতে উপস্থাপিত হয় এক নতুন বিশ্ববীক্ষা, সঙ্গতিপূর্ণ বস্তুবাদ, যা সমাজ জীবনের পরিমন্ডলকেও অঙ্গীভূত করে; উপস্থাপিত হয় বিকাশের সর্বাপেক্ষা সহজবোধ্য ও সুগভীর মতবাদ হিসেবে দ্বন্দ্বতত্ত্ব; আর উপস্থাপিত হয় শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্ব, নতুন কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা– সর্বহারা শ্রেণীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক ভূমিকার তত্ত্ব ।
 
 ১৮৮১ সালের ২রা ডিসেম্বর তাঁর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলেন, আর ১৪ই মার্চ, ১৮৮৩ নিজের আরাম কেদারায় শান্তভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মার্কস। লন্ডনের হাই গেট সমাধিক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রীর কবরের ঠিক পাশেই তিনি সমাধিস্থ হয়ে আছেন। মার্কসের সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ লন্ডনে মারা যায়, যখন চরম দারিদ্রের এক অবস্থায়ই পরিবারটি বসবাস করছিল। এলিনোর আভেরিং, লোরা লাফার্গ ও জেনী লঙে – মেয়েদের এই তিনজনের বিয়ে হয় ইংরেজ ও ফরাসী সমাজতন্ত্রীদের সাথে। শেষোক্ত জনের পুত্র ফরাসী সমাজতন্ত্রী পার্টির একজন সভ্য।
(লেনিনের লেখা থেকে)