আমলা আর ব্যাংকের ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে

সাক্ষাৎকার: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০১৫, ১১:৫৩ অপরাহ্ন
people-rising-against-bureaucracy-and-and-ban

প্রশ্নঃ  ২০১৫ সালে বিশ্ব পরিস্থিতি খুব অস্থির মনে হচ্ছে। কিন্তু যদি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি তবে  বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কি আশাবাদী না হতাশ ?

নোয়াম চমস্কিঃ  বিশ্ব প্রেক্ষাপট দেখে মনে হচ্ছে আমরা দ্রুত গভীর খাদের দিকে যাচ্ছি, যা অচিরেই আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে ।

প্রশ্নঃ  কি সেই খাদ ?

নোয়াম চমস্কিঃ  প্রধানত দুটি। একটা হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয় যা প্রায় আসন্ন এবং যেটা মোকাবিলা করার জন্য অঢেল সময় আমাদের হাতে নেই এবং আমরা এক্ষেত্রে ভুল পথেই এগোচ্ছি। আরেকটা হচ্ছে পরমাণু যুদ্ধের হুমকি যা প্রায়  আজ ৭০ বছর ধরে বিরাজমান এবং বাস্তবে তা বেড়েই চলেছে। যদি আমরা  রেকর্ড দেখি তবে মনে হয় আমরা যে বেঁচে আছি সেটাই এক বিস্ময়কর  ব্যাপার।

প্রশ্নঃ  পরিবেশগত  বিষয়ে আসা যাক। আমরা আমাদের সামজিক মাধ্যমের দর্শক-শ্রোতাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন পাঠাতে বলেছিলাম এবং আমরা প্রচুর প্রশ্ন পেয়েছি। এনয়া আগলি নামের একজন প্রশ্ন করেছেন- দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আপনার মতামত কি ?

নোয়াম চমস্কিঃ  মানব প্রজাতির বয়স প্রায় এক লক্ষ বছর এবং এখন মানব প্রজাতি ইতিহাসের এক অদ্বিতীয় সময়ের মুখোমুখি। মানব প্রজাতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তাকে  আগামী কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে এই তথাকথিত বুদ্ধিমান জীবনের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি চলবে নাকি আমরা এটাকে ধ্বংস করতে সংকল্পবদ্ধ ? সিংহভাগ  বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন যে অধিকাংশ জীবাশ্ম জ্বালানী ভূ-অভ্যন্তরেই রেখে দিতে হবে  যদি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর জীবনের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে চাই। কিন্তু আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তার শেষ বিন্দু পর্যন্ত শুষে নিতে চাইছে।  জলবায়ু পরিবর্তনের যে সম্ভাব্য প্রভাব তা মানব জাতির উপর এক আকস্মিক মহাদূর্যোগ ডেকে আনবে আর তা খুব বেশী দূরে নয় এবং আমরা সেই খাদের দিকেই দ্রূত এগোচ্ছি ।          

প্রশ্নঃ  পরমাণু যুদ্ধের ক্ষেত্রে যদি দেখি, ইরানের সাথে আলোচনা একটা প্রাথমিক মতৈক্যে পৌছানোর সম্ভবনা তৈরী হয়েছে। এটা কি আপনাকে কোনো আশার আলো দিচ্ছে যে পৃথিবী একটা সম্ভাব্য নিরাপদ আবাসে পরিণত হতে পারে ? 

নোয়াম চমস্কিঃ  আমি ইরানের সাথে সমঝোতার পক্ষে। কিন্তু এটা বড় রকম ত্রুটিপূর্ণ। দুটি রাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অবিরতভাবে সন্ত্রাস, বেআইনী কর্মকান্ড, সহিংসতা ও আগ্রাসন চালিয়ে এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল  করে রাখছে। তারা উভয়েই পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র। কিন্তু তাদের পরমাণু যুদ্ধ উপকরণ ও পরমাণু অস্ত্রকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।  

প্রশ্নঃ  আপনি প্রকৃতপক্ষে কাকে বোঝতে চাইছেন ?

নোয়াম চমস্কিঃ  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। দূই প্রধান পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। আমি এটা বলছি কারণ আমেরিকান সংস্থা পরিচালিত বিশ্ব জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রকেই বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে, এমনকি আর কোনো দেশই তার ধারেকাছেও নেই। কিন্তু মজার বিষয় মার্কিন মিডিয়া এই ফল প্রকাশে করতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু এতে তা শেষ হয়ে যায় না।   

প্রশ্নঃ  আপনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে খুব উচ্চ সম্মানের চোখে দেখেন না।কিন্তু এই চুক্তির ফলে কি আপনার কাছে তার অবস্থান একটু উন্নত হয়েছে ? বাস্তবিকই তিনি তো পরমাণু যুদ্ধের হুমকি কমানোর চেষ্টা করছেন ?

নোয়াম চমস্কিঃ  প্রকৃতপক্ষে তিনি তা করছেন না। তিনি সম্প্রতি মার্কিন পরমাণু অস্ত্র ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের জন্য ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি শুরু করেছেন, যার মানে পরমানু অস্ত্র ব্যবস্থার আরো সম্প্রসারণ। যার কারণে ‘বুলেটিন অব এ্যাটোমিক সায়েন্টিস্ট’ তাদের স্থাপিত ‘ডুম’স ডে ক্লক’ দুই মিনিট এগিয়ে দিয়েছে। এটি এখন মধ্যরাতের থেকে মাত্র তিন মিনিট দূরে। মধ্যরাতই  হচ্ছে ঘড়ির শেষ সীমা। রিগানের সময়ের বড় যুদ্ধ আশংকার পর গত ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি এখন মধ্যরাতের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছে।

প্রশ্নঃ  ইরানের প্রেক্ষাপটে আপনি আমেরিকা ও ইসরাইলের উল্লেখ করেছেন। এখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু চান না ‘ইরান পরমাণু চুক্তি’ কাজ করুক এবং তিনি বলেছেন…

নোয়াম চমস্কিঃ  এটা মজার বিষয়। আমরা প্রশ্ন করবো - ‘কেন’ ?

প্রশ্নঃ  কেন ?

নোয়াম চমস্কিঃ   কেন, সেটা আমরা  জানি। আমেরিকার তুলনায় বাদই দিলাম, এমনকি ওই অঞ্চলের পরিমাপেই ইরানের সামরিক ব্যয় খুব কম। ইরানের কৌশলগত নীতি হচ্ছে আত্মরক্ষা, এটার পরিকল্পনা করা   হয়েছে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এবং তা কূটনৈতিক তৎপরতার অনেক আগে থেকেই। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দুই উগ্র দেশ কোনো প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে চায় না। কোনো কৌশলগত বিশ্লেষণই যা নূন্যতম বুদ্ধির সাহায্যে করা হয়েছে সেটা চিন্তাও করবে না যে ইরান কখনো তার পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। এমনকি যদি তারা এটা করার কোনো  প্রস্তুতিও নেয় তবে দেশটি একাবারে সহেজেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং আপনি যাই মনে করুন না এটার কোনো লক্ষ্মণই নেই যে ক্ষমতাসীন ধর্মীয় শাসকরা(ইরানের) দেখতে চাইবে তারা সবকিছু ধ্বংস করে ফেলেছে।    

প্রশ্নঃ  এই বিষয়ে আর একটা প্রশ্ন আছে, এবং সেটাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে। মর্টান.এ.এন্ডারসন নামের একজন প্রশ্ন করেছেন- “আপনি কি মনে করেন আমেরিকা কখনো এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে যা ইসরাইল জন্য ক্ষতিকর হবে ?”

নোয়াম চমস্কিঃ  আমেরিকা নিয়মিত ভাবেই এমন পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছে যা ইসরাইলের জন্য মারাত্মক। মূলত ইসরাইলের নীতিকে সর্মথন দিয়ে। গত ৪০ বছর ধরে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে তার  নিজের নীতি। আপনি যদি ৪০ বছর আগে ফিরে তাকান, ধরা যাক ৭০ দশকের কথা, তবে আপনি দেখবেন তখন ইসরাইল ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রদ্ধাপূর্ন ও প্রশংসিত দেশগুলোর একটি।তার  প্রতি অনেক সহমর্মিতাপূর্ণ মনোভাব ছিল। এখন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দনীয় ও ভীতির রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম। ৭০ এর দশকের সূচনাতে ইসরাইল একটি সিদ্ধান্ত নেয়। তারা নিরাপত্তার জন্য অধিগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয় যার ফলাফল হয় মারাত্মক। যে ফলাফল গুলো অবিশ্যম্ভাবী সে সমন্ধে আমি ঐ সময় লিখেছিলাম, অন্যরাও বলেছে-  যে এতে করে সমাজ অভ্যন্তরীন ভাঙ্গণ, উদ্বিগ্নতা ও পৃথকীকরণের দিকে ধাবিত হবে, যার সম্ভাব্য শেষ পরিণতি হচ্ছে  ধ্বংস। আর এইসব নীতিতে সমর্থন দিয়ে আমেরিকাই ইসরাইলের হুমকির প্রতি সবচেয়ে বেশী অবদান যুগিয়েছে।   

প্রশ্নঃ  এবার সন্ত্রাস প্রসঙ্গে আসা যাক।  কারণ এটা একটা বৈশ্বিক ক্যান্সারের মত হয়ে গেছে এবং আমার মনে হয় অনেকের মত আপনিও বলবেন যে এটা বিশ্বব্যাপী মার্কিন সন্ত্রাসবাদ নীতির পাল্টা প্রতিক্রিয়া। আমরা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখছি তার জন্য মার্কিন ও তার মিত্ররা  কতটুকু দায়ী ?

নোয়াম চমস্কিঃ  মনে রাখতে হবে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচে্যে জঘন্যতম সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হচ্ছে যা এখন ওয়াশিংটন করছে। সেটা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী হত্যা অভিযান। এত বড় সন্ত্রাসী অভিযান এর আগে আর কখনোই দেখা যায় নি।

প্রশ্নঃ  বিশ্বব্যাপী হত্যা অভিযা্ন…?

নোয়াম চমস্কিঃ  ড্রোন অভিযান, এটাই মূলত। আমি যা বলছি তাতে কোনো গোপনীয়তা নেই, আমরা সবাই এটা জানি, পৃথিবীর বিশাল অংশজুড়ে আমেরিকা কৌশলে, রাষ্ট্রীয়ভাবে, প্রকাশ্যে নিয়মিত হত্যা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এমন মানুষদের হত্যা করতে যাদেরকে আমেরিকান সরকার মনে করে যে তারা কোনো একদিন আমেরিকার ক্ষতি করতে পারে। এবং বস্তুত আপনি যেটা উল্লেখ করেছেন, এটা  আসলেই একটা সন্ত্রাস উৎপাদনকারী অভিযান। উদাহরণস্বরূপ আপনি যখন ইয়েমেনের একটা গ্রামে  বোমা মারছেন এবং এমন একজন মানুষকে হত্যা করছেন হতে পারে সে আপনার লক্ষ্যবস্তু আবার হতে পারে অন্য কেউ, এমনকি আশেপাশের মানুষজন। আপনার কি মনে হয়, তারা কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে ? তারা অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে অগ্রসর হবে।  

প্রশ্নঃ  আপনি আমেরিকাকে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের অবস্থান কোথায় ?

নোয়াম চমস্কিঃ  এটা একটা মজার প্রশ্ন। সম্প্রতি একটি গবেষণা হয়েছে। আমার মনে হয় এটা করা হয়েছে ‘ ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন’ থেকে। বলা হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্যতম নির্যাতন হচ্ছে  ‘রেন্ডিসন’। রেন্ডিসন বলতে বোঝায় কাউকে আপনি কোনো সন্দেহবশত আটক করলেন এবং তারপর তাকে আপনার পছন্দনীয় কোনো স্বৈরশাসকের যেমন ধরুন আসাদ বা গাদ্দাফি বা মুবারকের হাতে তুলে দিলেন  নির্যাতনের জন্য। যাতে আপনি আশা করছেন এ থেকে কিছু বেরিয়ে আসবে। এই গবেষণা দেখিয়েছে কোন দেশগুলো এতে অংশ নেয়- অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকরা,  কারণ ওখানেই নির্যাতনের জন্য পাঠানো হয় এবং পাশাপাশি ইউরোপ অংশ নেয়। ইউরোপের  অধিকাংশ দেশ অংশ নেয়; ইংল্যান্ড, সুইডেন এবং অন্যান্য দেশ। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকাই একমাত্র অঞ্চল যেখান থেকে  কোনো দেশ অংশ নেয় না। এটা বেশ কৌতুহোলোদ্দীপক। প্রথমত ল্যাটিন আমেরিকা এখন প্রায় মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু কিছুকাল আগেও যখন এ অঞ্চল মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন এটা ছিল বিশ্বের নির্যাতনের কেন্দ্র। কিন্তু এখন এ অঞ্চল এধরণের জঘন্যতম অত্যাচারে অংশ নেয় না।কিন্তু ইউরোপ অংশ নেয়। সুতরাং যদি প্রভু হুঙ্কার দেয়, দাস ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়।    

প্রশ্নঃ  তাহলে ইউরোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাস ? 

নোয়াম চমস্কিঃ  অবশ্যই। তার এতই ভীরু-কাপুরুষ যে, তারা কোনো স্বাধীন অবস্থান নিতে পারে না ।

প্রশ্নঃ  এই দৃশ্যপটে ভ্লাদিমির পুতিনের অবস্থান কোথায়। তাকে তো নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। আসলেই কি সে তাই ?

নোয়াম চমস্কিঃ  অধিকাংশ নেতার মতোই সেও তার নিজ জনগণের জন্যই সবচেয়ে বড় হুমকি। সেও অবৈধ পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তাকে একজন  বিকৃত মস্তিষ্ক ও  স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে আক্রান্ত ইদুরমুখো শয়তান হিসেবে চিত্রিত করা- এগুলো অরোয়েলিয়ান উদ্ভট কল্পনা মাত্র। আমি বোঝাতে চাচ্ছি, আপনি তার  নীতির সম্বন্ধে যাই ভাবুন না কেন, সেগুলো বোধগম্য। ইউক্রেন পশ্চিমা সামরিক জোটে যোগ দিতে পারে এই চিন্তা যেকোনো রুশ নেতার কাছেই অগ্রহণযোগ্য। এর  জন্য ফিরে যেতে হবে ৯০ দশকে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেল। তখন একটা প্রশ্ন ছিল যে, ন্যাটোর বিষয়ে কি হবে। এখন গর্বাচেভ দুই জার্মানীর একত্রীকরণে  এবং তাদের ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে রাজী হলেন। এই চমকপ্রদ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এই প্রলেপণের আড়ালে যে, ন্যাটো আর এক ইঞ্চিও পূর্বে আগাবে না। সেদিন এই বুলিই আওড়ানো হয়েছিল।

প্রশ্নঃ  সুতরাং রাশিয়াকে উসকে দেওয়া হয়েছিল ?

নোয়াম চমস্কিঃ  বেশ, কী ঘটল? ন্যাটো দ্রূত পশ্চিম জার্মানীতে অগ্রসর হল এবং সেসময়ই ক্লিনটন ক্ষমতায় আসে আর ন্যাটোকে একেবারে রাশিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত করে। এখন ইউক্রেনের আগের সরকারকে  উৎখাত করে নতুন যারা ক্ষমতায় আসলো তারা সংসদের ভোটে সিদ্ধান্ত পাস করে যে তারা নাটোতে যোগ দেবে ।  

প্রশ্নঃ  কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন কেন তারা ন্যাটোতে যোগ দিতে চাইছিল, পেত্র প্রচেনকো সরকার খুব সম্ভবত মনে করেছিল এতে দেশকে রক্ষা করা যাবে?

নোয়াম চমস্কিঃ  না,না, এটা মোটেও দেশকে রক্ষা করা নয়। ক্রিমিয়ার সরকারকে উৎখাত করে ক্রিমিয়া দখল করা হয়। আর এটা মোটেও ইউক্রেনকে নিরাপত্তা দেওয়া নয় বরং ইউক্রেনকে আরো বড় যুদ্ধের হুমকির মুখে দাঁড় করানো।আর এটা রাশিয়ার জন্য মারাত্মক হুমকি, সুতরাং সহজেই বোঝা যায় যেকোনো রাশিয়ান নেতাই এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

প্রশ্নঃ আমরা যদি ইউরোপের দিকে তাকাই তো সেখানে বেশ মজার ঘটনা ঘটছে। আমরা দেখছি সাইরিজা(বামপন্থী ও সোস্যাল ডেমক্র্যাট জোট) সরকারের অধীনে গ্রীস ধীরে ধীরে প্রাচ্যের দিকে ঝুকছে। স্পেন এবং হাঙ্গেরীও। স্পেনে পদেমস পার্টি(বামপন্থী দল) বেশ শক্তিশালী হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন ইউরোপ ধীরে ধীরে রাশিয়ার স্বার্থের সাথে একীভূত হচ্ছে ? 

নোয়াম চমস্কিঃ  দেখুন, হাঙ্গেরীর বিষয়টা সূম্পর্ণ আলাদা। গ্রীসে সাইরিজা জোট ক্ষমতায় এসেছে একটা জনজোয়ারের ফলে। সেই জনজোয়ারটা ছিল যে গ্রীস, ব্রাসেলস ও জার্মান ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী আর চলবে না।  কারণ এই নীতির ফলে গ্রীসের সম্পদের তুলনায় ঋণের বোঝা অনেক বেড়ে গেছে।তরুণ প্রজন্মের  প্রায় অর্ধেক বেকার, প্রায় ৪০% মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে, গ্রীস প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

প্রশ্নঃ  তাদের ঋণ কি মওকুফ করা হবে ?

নোয়াম চমস্কিঃ  হ্যাঁ, ঠিক জার্মানীর মত। ১৯৫৩ সালে ইউরোপ জার্মানীর সব ঋণ মওকুফ করে, যাতে জার্মানী যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্নঃ  কিন্তু তাহলে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে কি হবে ?

নোয়াম চমস্কিঃ  একই ব্যবস্থা।

প্রশ্নঃ  তার মানে পর্তুগাল, স্পেন এদের ঋণও মওকুফ করা হবে ?

নোয়াম চমস্কিঃ  কে ঋণ নিয়েছে? এবং কে ঋণী? মার্কিন মদদপুষ্ট গ্রীসের ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসকরা এই ঋণের সিংহভাগ নিয়েছে। ঋনের এই বোঝা স্বৈরশাসনের চেয়েও নির্মম এবং আন্তর্জাতিক আইনে  এ ধরণের ঋনকে বলা হয় ‘ওডিয়াস লোন’। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এই ঋণ পরিশোধ করার প্রয়োজন নেই। যুক্তরষ্ট্র নিজের স্বার্থেই এই আইন প্রণয়ন করেছিল। গ্রীসের ঋণের অধিকাংশই হচ্ছে জার্মান ও ফরাসী ব্যাংকের কাছে তার বাকী পেমেন্ট। এটা তখনই ঝুকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়েছিল।    

‏ প্রশ্নঃ  গ্রীল গ্রীবাউডো নামের একজন প্রশ্ন করেছেন “বর্তমানে ইউরোপ যে অস্তিত্ব সংকটের হুমকির মুখে, সেটা ইউরোপ কিভাবে মোকাবিলা করবে?” কারণ বাস্তবেই ইউরোপে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারণার উদ্ভব হচ্ছে। আপনিও বলেছেন পুরো ইউরোপ জুড়েই বেশ সাংস্কৃতিক সংকট তৈরী হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ কিভাবে পরিবর্তিত হতে পারে ? 

নোয়াম চমস্কিঃ  ইউরোপের মারাত্মক সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যার অনেকগুলোই তৈরী হয়েছে ন্যাটো, জার্মান ব্যাংক আর ইউরোপীয় কমিশনের আমলাদের নেওয়া অর্থনৈতিক নীতির কারণে। এই নীতির কুশীলবদের দিক থেকে এসবের অনেক ন্যায্যতা রয়েছে। প্রথমত তারা তাদের বিতরণ করা লোন ও বিনিয়োগ উঠিয়ে আনতে চায় এবং দ্বিতীয়ত তারা এই নীতির মাধ্যমে কল্যাণ রাষ্ট্রগুলো ধ্বংস করছে, কারণ তারা কখনই এই কল্যাণ রাষ্ট্র পছন্দ করত না। কিন্তু কল্যাণ রাষ্ট্র হচ্ছে  আধুনিক সমাজে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অবদানের একটি । ধনী ও ক্ষমতাবানরা এটা কখনই  পছন্দ করেনি। সেই দিক থেকে কল্যাণ রাষ্ট্র ধ্বংস করার এই নীতি তাদের কাছে ইতিবাচক। 

ইউরোপের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে উগ্র বর্ণবাদ। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে আমেরিকার তুলনায় ইউরোপ অনেক বেশি বর্ণবা্দী। অতীতে ইউরোপে এতটা বর্ণবাদ দেখা যায় নি, কারণ তখন ইউরোপের জনগন ছিল প্রায় সমগোত্রীয়। সুতরাং যদি সবাই সোনালী চুল ও নীল চোখের মানুষ হয় তবে বর্ণবাদী আচরণের  প্রশ্ন নেই। কিন্তু যখন থেকে জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করলো তখনই  খুব দ্রুত বর্ণবাদী  আচরণ  ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। এটাই ইউরোপের একটা মারাত্মক সাংস্কৃতিক সংকট।

 প্রশ্নঃ  আমরদের শেষ করতে হবে। রবার্ট লাইট নামের একজন জানতে চেয়েছে- আপনার মতে  আশার জায়গা কোনটি ?

নোয়াম চমস্কিঃ  যা আমাকে আশা দেয় সেটা হলো ল্যাটিন আমেরিকা। সম্প্রতি আমেরিকান সম্মেলনে আমরা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা দেখেছি। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।  ১০-২০ বছর আগের তুলনায় এটা একটা আমুল পরির্বতন। এই যে ওবামা কিউবার প্রতি মনোভাব পরিবর্তন করেছে তার কারণ সে এই বিচ্ছিন্নতাকে কাটাতে চাইছে। বস্তুত এখন কিউবা নয়, মার্কিনই বিচ্ছিন্ন। আর ইউরোপের ক্ষেত্রে আশার লক্ষণ হচ্ছে সাইরিজা ও পোদেমস। আশার বিষয় হচ্ছে আমলা আর ব্যাংকের ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে।

-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।  

নোয়াম চমস্কি এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্বে সবচেয়ে আলোচিত বুদ্ধিজীবী। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে জেনোরেটিভ তত্ত্বের প্রবর্তন করেন তিনি। এম. আই. টি.’র ভাষাবিজ্ঞান ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক চমস্কি তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের জন্য বিখ্যাত। গত ১৭ই এপ্রিল ইউরোনিউজে তার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছে পোস্টকার্ড অনুবাদ বিভাগ )