মার্ক্স ইন সোহো - হাওয়ার্ড জিন; ভাষান্তর: জাভেদ হুসেন

শিল্প ও সাহিত্য: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৯ মে ২০১৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন
marxinsoho_pc

চে গেভারা পশ্চিমা ছবিতে এসেছেন। চেনামে ছবিতে খ্যাতনামা অভিনেতা ওমর শরিফ অভিনয় করেছেন ক্যাস্ত্রোর চরিত্রে। রোযা লুক্সেম্বুর্গকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে। বক্স অফিস হিট ফ্রিডাতে ট্রটস্কি চিত্রিত হয়েছেন বেশ সহানূভুতির সাথে। বিবিসির পুরোনো সিরিয়াল The life of Reilly তে-লেনিনও এসেছেন। কিন্তু কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে কিছু নেই। এমন কী যখন সমস্ত পৃথিবীর অর্ধেক যখন সমাজতান্ত্রিকতখনো এরকম কোন চেষ্টা হয়নি। সের্গেই আইজেন্সটাইন মার্ক্সের 'ডাস কাপিটেল' নিয়ে ছবি তৈরির ভাবনা ছকে রেখেছিলেন, তিনিও খোদ মার্ক্স'কে নিয়ে কিছু করার কথা উল্লেখ করে যাননি। ২০০৭ সালে হাইতি বংশোদ্ভুত সিনেমা পরিচালক রাউল পেক  একটা সিনেমার কাজ শুরু করেন, নাম Le juene Karl Marx (তরুন মার্ক্স)। জানা যায় এতে মার্ক্সের বার বছর বয়স থেকে পারিতে ১৮৪৮ সালে কমিউনস্ট ইশতেহার লেখা পর্যন্ত মার্ক্সের জীবন চিত্রিত হবে। শেষ কালে এই ২০১৩ সালে এসে পেক  Centre national du cinema et de Iimage animee (CMC) নামে ফরাসি সরকারি সংস্থার কাছ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার অনুদান পাচ্ছেন। এ বছর (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে শুটিং শুরু হবে।

তবে এসব  তো পরের কথা। এখন পর্যন্ত হাতে ধন হচ্ছে হাওয়ার্ড জিন-এর মার্ক্স ইন সোহোনামে নাটক। হাওয়ার্ড জিন (১৯২২-২০১০) এই এক দৃশ্যের এবং এক চরিত্রের নাটক লেখেন ১৯৯৯ সালে। তিনি একজন মার্কিন ঐতিহাসিক, লেখক, নাট্যকার ও সোশাল এক্টিভিস্ট। পেশায় ছিলেন বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাঁর লেখা A peoples History of the United States নামের জনইতিহাসের বই ১৯৮০ সনে ছাপা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ'র বরাতে জানা যায়, এখনো বইটি প্রতি বছর গড়ে এক লাখ কপি বিক্রি হয়। লেখকের মতে তিনি এটি লিখেছেন এমন মার্ক্সকে তুলে ধরতে যে, এক জন বাবা, স্বামী, বন্ধু, যে স্ত্রী আর সন্তানের খাওয়া-পড়া জোগার করতে লড়াই করছে, যে মার্ক্সকে খুব কম মানুষ চেনে। নাটকে দেখা যায় মার্ক্স ফিরে এসেছেন আজকের সময়ে, তাঁর নামে চালু অপবাদগুলোর জবাব দিতে। সমকালীন বিশ্বপরিস্থিতিতে তিনি মোটেই বিস্মিত নন, জগত তিনি বদলানোর কথা বলেছেন প্রতিয়মানতা বদলালেও অন্তরে-বাহিরে সেই একই পৃথিবী রয়ে গেছে। ফলে তিনি বেশ পরিহাসের সুরে প্রশ্ন করেন, এরা সবাই দাবী করছে আমার চিন্তার মৃত্যু ঘটেছে। নতুন কিছুনা। এই ভাড়গুলো এই একই কথা গত একশো তিরিশ বছর ধরে বলে আসছে। আচ্ছা, আপনাদের অবাক লাগে না, আমি যদি সত্যিই মরে গিয়ে থাকি, তাহলে বার বার আমার মৃত্যু কেন ঘোষণা করতে হয়?আর হাওয়ার্ড জিনের আশা, মার্ক্স ইন সোহো কেবল তাঁর কাল আর সেই কালে তাঁর স্থান নির্ধারণ করবেনা, বরং সেই সাথে আমাদের সময়কে তুলে ধরবে

ভাষান্তরের ক্ষেত্রে কোন অপ্রয়োজনীয় স্বাধীনতা নেয়া হয়নি, অবিকল সংলাপ অনূসরণ করা হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে রেফারেন্স প্রাসঙ্গিকভাবে এই দেশের থেকে এসেছে, যেমন জিন উল্লেখ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ কেরোলাইনার একটা চিকেন প্রসেসিং ফ্যাক্টরির কথা। সেখানে কাজ চলার সময় গেটে তালা লাগিয়ে রাখায় আগুন লাগলে পরে ২৫জন শ্রমিক জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। বাংলা পাঠক/দর্শক এই জায়গায় তাজরিনের প্রসঙ্গে নিশ্চই অস্বস্তি বোধ করবেননা। এ দেশে বসে লিখলে বোধ হয় হাওয়ার্ড জিন-ও এর কথাই লিখতেন।

মার্ক্স ইন সোহো

 

(মঞ্চ আংশিক আলোকিত। মঞ্চের মাঝখানে আলো। একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার ছাড়া মঞ্চে আর কিছু নেই। মার্ক্সের প্রবেশ। পরণে কালো ফ্রক কোট আর ভেস্ট, সাদা শার্ট, কালো ফ্লপি টাই। তিনি বেশি লম্বা নন, পেটানো শরীর, দাড়ি আছে, কালো গোফ আর চুলে পাক ধরা শুরু হয়েছে, চোখে স্টিল রিমের চশমা। হাতে একটা থলে। থামলেন, হেটে মঞ্চের কিনারে এলেন, দর্শকদের দিকে ভালো করে তাকালেন, মনে হল খুশি, একটু অবাকও।)

দর্শক! বাহ্!

(থলে হতে বের করলেন কয়েকটা বই, পত্রিকা, এক বোতল বিয়ার, একটা গ্লাস। ঘুরে মঞ্চের সামনের দিকে হেটে এলেন)

ভালো হল আপনারা এসেছেন। আচ্ছা, ঐ যে কিছু গর্দভ বলে বেড়ায়, ‘মার্ক্স মৃত’ওরা আপনাদের আটকায়নি? তা... আমি মৃত... আবার মৃত নই। দ্বান্দিকতা... কী বুঝলেন?

(নিজেকে বা নিজের ধারণা নিয়ে ঠাট্টা করলে তিনি কিছু মনে করেন না। বোধ হয় এতো বছরে একটু কোমল হয়েছেন। কিন্তু যেই মনে হবে মার্ক্স কোমল হয়েছেন। অমনি রাগের দমকা হাওয়া)

আপনারা বোধ হয় অবাক হচ্ছেন আমি কেমন করে এখানে এলাম... (দুষ্টুমির হাসি)... পাব্লিক বাসে চড়ে।

অবশ্য এখানে আসার কথা ভাবিনি... আমি যেতে চেয়েছিলাম সোহা। লন্ডনে ওখানেই থাকতাম। কিন্তু... ঐ যে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ফলে সোহা’র বদলে আমি এখানে।

(গ্লাসে কিছু বিয়ার ঢেলে চুমুক দিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন)

(মনের ভাব বদলে যায়)

আমি কেন ফিরে এলাম?

আমার নামে অপবাদগুলো পরিষ্কার করত।

(রাগ সামলে নিলেন)

আপনাদের পত্রিকাগুলো পড়ছিলাম... (একটা পত্রিকা তুলে নিলেন) এরা সবাই দাবী করছে আমার চিন্তার মৃত্যু ঘটেছে। নতুন কিছুনা। এই ভাড়গুলো এই একই কথা গত একশো তিরিশ বছর ধরে বলে আসছে। আচ্ছা, আপনাদের অবাক লাগে না, আমি যদি সত্যিই মরে গিয়ে থাকি, তাহলে বার বার আমার মৃত্যু কেন ঘোষণা করতে হয়?

ফলে আমাকে আসতেই হল। ঘোষণা করলাম আমার ফিরে আসার অধিকার আছে, সামান্য সময়ের জন্য। তবে নিয়ম-কানুন আছে,  ঐ যে বললাম আমলাতন্ত্র। আপনি পড়তে পারবেন দেখতে পারবেন, কিন্তু আসতে পারবেন না। অবশ্যই আমি প্রতিবাদ করলাম। কিছু সমর্থনও জুটে গেল... সক্রেটিস ওদের বললেন... ‘অপরিক্ষীত জীবন বাঁচার যোগ্য নয়।’গান্ধি অনশন করলেন। মাদার জোনস অবরোধের হুমকি দিলেন। মার্ক টোয়েন তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বেখাপ্পা ধরণে আমার সমর্থনে এগিয়ে এলেন। বুদ্ধ বললেন সব্বে সত্তা...। অবাক কাণ্ড! বাকিরা সবাই চুপ। এখনো ওদের কী হারানোর ভয়?

হ্যাঁ, ওখানেও আমার ঝামেলাবাজ লোক হিসেবে খ্যাতি আছে। এমন কি ওখানেও প্রতিবাদ করলে কাজ হয়। শেষ পর্যন্ত ওরা বললো, ‘ঠিক আছে, যেতে পারো, মনের  কথাগুলো বলার জন্য এক ঘন্টার মত সময় পাবে। তবে মনে রাখবে কোন গণ্ডগোল নয়।’ওরা বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে... তবে একটা সীমা পর্যন্ত (হেসে) ওরা উদারপন্থী।

আপনার বরং এই কথা ছড়িয়ে দিতে পারেন - মার্ক্স ফিরে এসেছে। অল্প সময়ের জন্য। তবে একটা কথা বুঝতে হবে-আমি মার্ক্সবাদি নই। (হাসি) এই কথাটা একবার পিপার’কে বলেছিলাম। বেচারার তো বিষম খেয়ে যা-তা অবস্থা। ও... পিপার কে তা তো বলিনি।

(এক চুমুক বিয়ার পান)

আমরা তখন লন্ডনে থাকি। জেনি, আমি, আমাদের ছোট দুই মেয়ে। সঙ্গে দুটো কুকুর, তিনটে বেড়াল আর দুটো পাখি। ডিন স্ট্রিটের ঘুপচি একটা ঘর। পাশেই শহরের সব আবর্জনা জমা করা হয়। লন্ডনে, কারণ আমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রাইনল্যান্ড, মানে আমার জন্মভূমি থেকে আমি বহিষ্কৃত।

আমি মারাত্বক বিপদজনক সব কাজ করতাম। রাইন দর্পন নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করতাম। পত্রিকাটাকে আর যাই হোক বিপ্লবী বলা যাবেনা। তবে আমার কাছে সব চাইতে বিপ্লবী কাজ কোনটাকে মনে হয় জানেন - সত্য বলা।

রাইনল্যান্ডে পুলিশ তখন নির্বিচারে গরীব মানুষদের গ্রেপ্তার করছে। অপরাধ কী? ওরা ধনীদের জমি থেকে জ্বালানি কাঠ জোগার করে। আমি এর প্রতিবাদ করে পত্রিকায় সম্পাকদীয় লিখলাম। ওরা আমাদের পত্রিকা সেন্সর করার চেষ্টা করলো। আমি আরেকটা সম্পাদকীয়তে লিখলাম যে জার্মানিতে গণমাধ্যমের কোন স্বাধীনতা নেই। আমার কথা যে ঠিক এটা প্রমাণ করার দায়িত্ব নিল সরকার। আমাদের পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হল। কেবল তখনি আমরা র‌্যাডিকেল হতে বাধ্য হলাম। রাইন দর্পন পত্রিকার শেষ সংখ্যায় বড় অক্ষরে লাল রঙে হেডলাইন ছাপা হল, ‘বিদ্রোহ কর’... কতৃপক্ষ বিরক্ত হল। রাইনল্যান্ড থেকে আমাকে বহিষ্কারের আদেশ হল।

ফলে আমি প্যারিসে চলে এলাম। নির্বাসিতরা আর কোথায় যাবে? আর কোথাও আপনি সারা রাত কাফেতে বসে, দেশে যে আপনি কত বড় বিপ্লবী ছিলেন সে নিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা বলার এত সুযোগ পাবেন না। নির্বাসনে যাওয়ার জন্য প্যারিস হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জায়গা।

প্যারিস ছিল আমাদের মধুচন্দ্রিমা। জেনি ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটা ছোট বাসা খুঁজে বের করলো। আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। খবরটি কেমন করে যেন জার্মান পুলিশদের কাছ থেকে প্যারিসের পুলিশের কাছে পৌঁছে গেল। শ্রমিকদের বহু আগে মনে হয় পুলিশের আন্তর্জাতিক চেতনা তৈরি হয়ে গেছে। প্যারিস থেকেও বহিষ্কৃত হলাম। গেলাম বেলজিয়াম। আবার বহিষ্কার।

আমরা লন্ডনে চলে এলাম। সারা দুনিয়া থেকে শরণার্থীরা এখানে ভিড় করেছে। ইংরেজদের সহিষ্ণুতা প্রশংসা যোগ্য। আর এটা নিয়ে ওদের অহংকার... অসহ্য।

(কাশলেন, একটু পর পরই কাশবেন। মাথা নাড়িয়ে)

ডাক্তার বলেছে কয়েক সপ্তাহে কাশি সেরে যাবে। তখন ১৮৫৮ সন।

ও হ্যাঁ, আমি তো পিপারকে নিয়ে কথা বলছিলাম। লন্ডনে দেশ থেকে আসা রাজনৈতিক শরণার্থীরা আমাদের বাসায় যখন তখন আসতো যেতো। পিপার ছিলো তাদেরই একজন। লোকটা ছিলো তোষামুদে, চাটুকার। মাছির মতো আমার চার পাশে ভন ভন করে বেড়াতো। আমার মুখের থেকে ঠিক ছয় ইঞ্চি দূরে মুখ রেখে কথা বলতো যাতে আমি এড়িয়ে যেতে না পারি। আমার লেখা থেকে আমাকেই উদ্ধৃতি শোনাতো। আমি বলতাম, ‘পিপার দয়া করে আমাকেই আমার লেখা শুনিয়ো না’।

লোকটার ঔদ্ধত্ত দেখুন, বলতো ও কিনা ডাস ক্যাপিটাল ইংরেজিতে অনূবাদ করবে। মনে করতো এসব কথা শুনলে আমি খুশি হবো। হাহ্। যে লোক ইংরেজি ভাষার বারোটা না বাজিয়ে একটা লাইন বলতে পারে না সে করবে ডাস ক্যাপিটেলের অনূবাদ। ইংরেজি খুব সুন্দর ভাষা, শেক্সপিয়ারের ভাষা। পিপারের মুখে এক লাইন ইংরেজি শুনলে শেক্সপিয়ার দুঃখে বিষ খেতেন।

তবে জেনির আবার ওর জন্য মায়া হত; মাঝে মধ্যে ওকে রাতে আমাদের সঙ্গে খাবার নিমন্ত্রন দিতো। তো এরকমই এক সন্ধ্যে বেলা সে ঘোষণা করলো সে ওরা লন্ডনে ‘মার্ক্সিস্ট সোসাইটি’গঠন করেছে।

‘মার্ক্সিস্ট সোসাইটি?’আমি বললাম। ‘এটা আবার কী?’

‘আমরা প্রতি সপ্তাহে আপনার কোন লেখা নিয়ে আলোচনা করি। লেখার প্রত্যেকটা বাক্য জোরে জোরে পড়া হয়। ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করা হয়। এজন্য আমরা নিজেদের নাম দিয়েছি মার্ক্সবাদি-আপনি যা কিছু লিখেছেন আমরা তা সর্বাত্ত্বকরণে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। ’

‘সর্বাত্ত্বকরণে, সম্পূর্ণ?’আমি প্রশ্ন করলাম।

‘অবশ্যই, ডক্টর মার্ক্স’, ও আমাকে সব সময় ডক্টর মার্ক্স বলে সম্বোধন করতো। ‘আপনি যদি মার্ক্সবাদি সমিতির আগামী সভায় এসে কথা বলেন আমরা খুবই সম্মানিত বোধ করবো।’

‘উহু, আমি তো তা করতে পারবো না’

‘কেন?’পিপার চমকে উঠে বললো।

‘কারন আমি মার্ক্সবাদি নই।’(প্রাণ খুলে হাসি)

পিপারের ইংরেজি নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না। আমার নিজের ইংরেজিও নিখুত না। ব্যাপারটা হল ওর চিন্তা করার ধরণ। ওর কাজই ছিলো আমার লেখা শব্দগুলোর চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া, দুনিয়ার সামনে সেগুলো ফলাও করে মেলে ধরা আর তা করতে গিয়ে মাথা-মুন্ডু গুলিয়ে ফেলা। তার পর সেই তাল-গোল পাকানো ব্যাখ্যাকে ধর্মান্ধের মত আগলে রেখে অন্য কারোর ব্যাখ্যা ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয়া।

আমি একবার জেনিকে বললাম, ‘জানো আমার সবচে’বড় ভয় কী?

ও বললো , ‘মেহনতি মানুষের বিপ্লব কোন দিন হবে না - এই ভয়?’

‘না, ভয় হলো যে বিপ্লব আসবে, আর তা পিপারের মত মানুষের দখলে চলে যাবে-ক্ষমতার বাইরে থাকলে ওরা চাটুকার আর ক্ষমতায় থাকলে উদ্ধত, নিজের মতে অন্ধ বিশ্বাসী। এরা সর্বহারার পক্ষে কথা বলবে আর দুনিয়ার সামনে আমার ভাবনা ব্যাখ্যা করে বেড়াবে। এরা বহিষ্কার করে, বিচার করে, ফায়ারিং স্কোয়াড বানিয়ে একটা নতুন পুরোহিততন্ত্র তৈরি করবে।

‘আর এই সবই হবে সাম্যবাদের নামে। পৃথিবীটা পূঁজিতান্ত্রিক সাম্রাজ্য আর কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যের নামে ভাগ করে এরা মুক্তির সাম্যবাদ শত বছর পিছিয়ে দেবে। এরা আমাদের সুন্দর স্বপ্নের বরোটা বাজাবে তার পর এই সব জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হয়তো আরো দু-তিনটে বিপ্লবের প্রয়োজন হবে। এই হচ্ছে আমার ভয়।

‘উহুঁ, পিপার কে আমি ডাস ক্যাপিটেল অনূবাদ করতে দিতে রাজি ছিলাম না। এই বইটাতে-সোহো’র মত নরকে আমার পনের বছরের শ্রম লুকিয়ে আছে। প্রতিদিন সকালে নর্দমার পাশে ঘুমিয়ে থাকা ভিখারিদের মাঝ দিয়ে হেটে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের লাইব্রেরিতে যাওয়া, প্রতিদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে কাজ-পড়া আর পড়া... পলিটিক্যাল ইকোনমি পড়ার চাইতে এক ঘেয়ে কিছু আছে?

(একটু ভেবে)

হ্যাঁ আছে, পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে লেখা।

তারপর অন্ধকার নেমে আসা গলি ধরে হেটে হেটে ঘরে ফেরা। কত কোলাহল-ফেরিওয়ালার চিৎকার, বিষাক্তধোয়া ভর্তি বাতাসে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈনিকদের ভিক্ষা চাওয়া, কারো পা নেই, কেউ অন্ধ... এই ছিল আমার লন্ডনের চেহারা।

ডাস কাপিটেল লিখতে আমাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আমার সমালোচকেরা তা খাটো করতে চেষ্টা কম করেনি। এখনো করছে। সব র‌্যাডিকেল লেখকদের নিয়েই ওরা এরকম আলামত করে। কী বলে ওরা, ‘ওহ্, নিশ্চয়ই মার্ক্সের ব্যাক্তি জীবনে কোন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওরা যদি এই বিষয়টা নিয়ে বাড়িয়ে ভাবতে চায় তাহলে বলি - অবশ্যই! সোহোর ঐ কুৎসিত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার ভেতরে যে ক্রোধ জন্মেছে তা জমা আছে এই ডাস কাপিটেলে।

আপনারা বলবেন, ‘হ্যাঁ, একশো বছর আগে ব্যাপারটা এমনই ছিলো।’একশো বছর আগে? আজকেও আমি যখন আপনাদের এই শহরের রাস্তা ধরে হেটে আসছিলাম চারদিকে আবর্জনার স্তূপ, বাতাসে দূর্গন্ধ, ফুটপাথে ঠান্ডায় মানুষ শুয়ে আছে। কোন মায়ের গলায় আমি ঘুম পাড়ানি গান শুনতে পাইনি, শুনেছি তারা তাদের বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য ভিক্ষা চাইছে।

(এবার ক্রোধ)

একে আপনারা বলেন উন্নয়ন? কেন? কারন আপনাদের দামি গাড়ি বাড়ছে, নতুন মডেলের ফোন আসছে, প্লেন আছে, এই দূর্গন্ধ তাড়ানোর জন্য হাজার রকমের সুগন্ধি আছে? আর একই সাথে মানুষ ঘুমাচ্ছে রাস্তায়?

(মার্ক্স একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে তার দিকে এক ঝলক দেখলেন)

একটা অফিসিয়াল রিপোর্ট, গত বছর এদেশে মোট জাতীয় উৎপাদন, (হ্যাঁ, মোট।) ছিল ১১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বেশ চমৎকার। কিন্তু আমাকে বলুন তো টাকাটা গেল কোথায়? এই টাকা থেকে কে লাভ করলো? কে করতে পারলো না?

(পত্রিকা থেকে পড়বেন)

এই পৃথিবীতে মাত্র ২০% লোক ৮০% সম্পদের মালিক। আচ্ছা, যে মা তার ছেলে মেয়েদের খাবার জোগার করতে পারছেনা, অসুখে কাতর বাচ্চার মুখের দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে, চিকিৎসার পয়সা নেই - ঐ লোকগুলো কি এই মায়ের চাইতে বেশি মহৎ, বেশি পরিশ্রমী, সমাজের কাছে এই মায়ের মূল্য তাদের চাইতে কম?

আজকে থেকে একশো ষাট বছর আগে আমি কি বলিনি যে, পুঁজিবাদ মারাত্বকভাবে সমাজে সম্পদ বাড়াবে, কিন্তু সেই সম্পদ জমা হবে অল্প কিছু লোকের হাতে?

(পত্রিকা থেকে পড়বেন)

‘ক্যামিলেক ব্যাঙ্ক আর ম্যানহাটান ব্যাংক এক হয়ে যাচ্ছে। বারো হাজার শ্রমিক চাকরি হারাবে। স্টক মার্কেটে কোম্পানির শেয়ারে মূল্য বৃদ্ধি। আর গর্দভগুলো বলে কী না আমার ভাবনার দিন শেষ!

আপনারা তো কবিতাটা শুনেছেন?

ইটের পরে ইট মাঝে মানুষ কীট

আপনাদের শহরের মাঝে পথ চলতে গিয়ে ঠিক এই ব্যাপারটাই আমি দেখলাম –নিষ্পেষিত, বিবর্ণ মানুষ, ক্ষয়ে যাওয়া মানুষ। বাড়ি ঘরে ক্ষয়, স্কুলে-কলেজে ক্ষয়, মানুষের মাঝে ক্ষয়। কিন্তু হাটতে হাটতে একটু এগিয়ে হঠাৎ করে চারদিকে দেখি প্রাচুর্য্য। মহিলাদের গায়ে দামি দামি গয়না, পুরুষদের বহুমূল্য পোষাক। তার পরেই হঠাৎ শুনি পুলিশের গাড়ির সাইরেন। কোথাও কী গোলমাল হচ্ছে? কেউ কি মোট জাতীয় উৎপাদনে তার অংশটুকু ছিনিয়ে নিচ্ছে অন্যায়ভবে, এমন কোন ধনী লোকের কাছ থেকে যে কী না তা ন্যায্যভাবে চুরি করেছে?

আহ্, কী চমৎকার এই বাজারভিত্তিক সমাজ। মানুষ এখানে পণ্য হয়ে যায়, তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে সবচে বড় পণ্য, যার নাম টাকা।

(হঠাৎ করে আলো জ্বলতে নিভতে থাকে, মার্ক্স ওপরের দিকে তাকিয়ে দর্শকদের বলেন।)

আমার কথাগুলো ওদের পছন্দ হচ্ছে না।

 (এবার তাঁর গলার স্বর কোমল হয়ে আসে, স্মৃতিকাতর)

সোহোর সেই ছোট্ট ঘরে জোনি গরম সুপ বানাতো, সঙ্গে সেদ্ধ আলু। রাস্তার ওপার থেকে আমি রুটি কিনি আনতাম। সবাই টেবিলের চারপাশে বসে খেতে খেতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হতো - আইরিশদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশের নেতাদের নির্বুদ্ধিতা, প্রচার মাধ্যমের কাপুরুষতা... এসব কি বদলেছে আজকাল? কী মনে হয় আপনাদের?

রাতের খাওয়া শেষ হলে, আমরা টেবিল পরিষ্কার করতাম। তার পর আমি ঐ টেবিলেই কাজে বসতাম। হাতে সিগার, সামনে এক গ্লাস বিয়ার। রাত তিনটে-চারটে পর্যন্ত কাজ করতাম। এক দিকে স্তূপ করে রাখা আমার বই, অন্য দিকে গাদা করে রাখা পার্লামেন্টারি রিপোর্ট। টেবিলের অপর দিকে জেনি, আমার লেখা কপি করতো। আমর হাতের লেখা বোঝে আর কারো সাধ্য ছিলো না। জেনি আমার লেখা প্রতিটি অক্ষর নিজ হাতে আবার লিখতো। ভাবতে পারেন কী ভয়াবহ কাজ।

মাঝে মধ্যে সমস্যাও হতো। না আন্তর্জাতিক কোন সমস্যা না। ধরুণ কোন বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন আমার রিকার্ডো খুঁজে পাচ্ছি না। জেনিকে বললাম, ‘আমার রিকার্ডো কোথায়?’

‘মানে প্রিন্সিপাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি?’বেচারি ভেবেছে বই আমার পড়া হয়ে গেছে, সে ওটা বন্ধক রেখে এসেছে।

আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ‘আমার রিকার্ডো। তুমি আমার রিকার্ডো বন্ধক দিয়ে এসেছো?’

জেনি বললো, ‘আস্তে। গত সপ্তায় আমার মায়ের দেয়া আংটিটাও বন্ধক দেয়া হয়েছে।’

এমনটাই হত। (দীর্ঘশ্বাস) আমরা সব কিছু বন্ধক রেখে টাকা জোগার করতাম। বিশেষ করে জেনির বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া উপহারগুলো। ওসব শেষ হলে আমাদের জামা-কাপড়। একবার শীতকালে-লন্ডনের শীত কেমন ভয়ানক আপনারা জানেন-আমাকে ওভার কোট ছাড়া কাটাতে হলো। আরেক বার বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হয়ে কিছু দূর হেটে গেছি, দেখি বরফে পা জমে যাচ্ছে। ব্যাপার কী? দেখি আমার পায়ে জুতো নেই। জুতো জোড়া গতকাল বন্ধক দেয়া হয়েছে, আমার মনে ছিলো না।

ডাস কাপিটেল যখন ছাপা হলো, আমরা সেলিব্রেট করলাম। তবে এঙ্গেলস টাকা দিয়েছিলো বলে দোকান থেকে থালা বাসনগুলো ছাড়িয়ে এনে রাতের খাবারটা আয়োজন করতে পেরেছিলাম। এঙ্গেলস... এক মহান মানুষ। ওকে অন্য কিছু বলে ডাকা যায় না। যখন আমাদের গ্যাসের লাইন কাটা, পানির লাইনও কাটা, ঘর অন্ধকার, আমাদের মনে হতাশা-তখন এঙ্গেলসই বিল চুকাতো। ওর বাবার ম্যানচেস্টারে ফ্যাক্টরি ছিলো। হ্যাঁ (হেসে) পুঁজিবাদ আমাদের বাঁচিয়েছে।

তবে সব সময় ও আমাদের দরকারের ধরণটা বুঝতো না, দেখা গেলো আমাদের মুদি দোকানের সওদা কেনার টাকা নেই, এঙ্গেলস তখন পাঠিয়েছে এক ডজন দামি ওয়াইন। একবার আমাদের ক্রীসমাস ট্রি কেনার পয়সা নেই। এঙ্গেলস হাজির ছয় বোতল শ্যাম্পেন নিয়ে। তো কী আর করা, আমরা মনে মনে একটা ক্রীসমাস ট্রি কল্পনা করে নিয়ে তার চার পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে শ্যাম্পেন খেলাম। ক্রীসমাসের গান গাইলাম। (মার্ক্স গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন)।

বুঝতে পারছি, আমার বিপ্লবী বন্ধুরা কী ভাবছেন, নাস্তিক মার্ক্স তার কী না ধর্মীয় উৎসব পালন!

হ্যাঁ, আমি ধর্মকে জনসাধারণের আফিম বলেছি, কিন্তু কেউ কি পুরো লেখাটা মনোযোগ দিয়ে পড়েছে? শুনুন (একটা বই তুলে পড়বেন)... ধর্ম হচ্ছে নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, প্রাণহীন পরিবেশের প্রাণ, এ হলো জনসাধারণের আফিম। ঠিক তাই, আফিম কোন সমাধান নয়, তবে ব্যাথা কমাবার জন্য তা দরকার হতে পারে। (মাথা নাড়বেন) আমার ফোড়ার ব্যাথা থেকেই আমি একথা জানি। আর আপনাদের কী মনে হয় না পুরো পৃথিবীটা পুঁজিবাদ নামের পেকে টনটনে হয়ে ওঠা একটা ফোড়া পিঠে নিয়ে অস্থির হয়ে আছে।

জেনির কথা মনে পড়ে। (থামবেন, চোখ ঘষবেন) কেমন করে সে সব মাল-সামান বাঁধা-ছাঁদা করে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে লন্ডনে এলো। সঙ্গে আমাদের দুই মেয়ে জেনিচেন আর লরা। ডিন স্ট্রিটে আমাদের ঠাণ্ডা, স্যাতস্যাতে ঘরে ও আরো তিন সন্তানের জন্ম দিল। ওদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কী প্রাণপণ চেষ্টা। চোখের সামনে তিন জনই মারা গেল। গুইডো, তখনো হাটা শেখেনি। ফ্রান্সেকার বয়স ছিল এক বছর। টাকা ধার করে ওকে কবর দিয়েছিলাম... আর মুশ বেঁচেছিলো আট বছর। ওর কী যে সমস্যা ছিলো, মাথাটা বড় হচ্ছিলো, কিন্তু বাকি শরীরটা বাড়লো না। যে রাতে ও মারা গেল, আমরা ওকে ঘিরে ভোর পর্যন্ত মেঝেতে শুয়ে রইলাম।

এলিয়েনর যখন জন্মালো, আমরা খুব ভয়ে ছিলাম, তবে ও ছিলো শক্ত ধাঁচের। তাও ভালো যে ওর বড় দুই বোন ছিলো। ওরা কোন মতে টিকে গিয়েছিলো। জেনিচেনের জন্ম প্যারিসে। প্যারিস প্রেমিকাদের জন্য অসাধারণ, শিশুদের জন্য ভয়াবহ। ওখানের বাতাসটাই যেন কেমন। দ্বিতীয় জন লরা, জন্ম ব্রাসেলসে। ব্রাসেলসে যেন কেউ না জন্মায়।

লন্ডনে আমাদের টাকা ছিলোনা। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে আমরা পিকনিকে যেতাম। ঘণ্টা দেড়েক হেটে সবাই মিলে গ্রামের দিকে চলে যেতাম। জেনি, আমি, বাচ্চারা আর লিনচেন। লিনচেনের ব্যাপারে বলবো। লিনচেন কিছু একটা রান্না করে নিয়ে যেতো। আমরা চা, রুটি, চিজ আর বিয়ার খেতাম। এলিয়েনর সব’চে ছোট, কিন্তু সেও বিয়ার খেতো।

টাকা নেই, কিন্তু বাচ্চাদের কোথাও বেড়ানো দরকার। একবার বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়ে ওদের বেড়াতে পাঠিয়ে দিলাম। বাচ্চারা গান খুব ভালোবাসতো। মাসের মুদি দোকানের টাকা দিয়ে ওদের পিয়ানো কিনে দিলাম।

বাবা হিসেবে কোন সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ঠিক না। কিন্তু এলিয়েনর! আমি জেনিকে বলতাম, ‘এলিয়েনর একটা অদ্ভুত বাচ্চা।’জেনি জবাবে বললো, ‘তুমি কি আশা কর কার্ল মার্ক্সের বাচ্চারা স্বাভাবিক হবে?’

এলিয়েনর ছিলো সবচে ছোট, সবচে মেধাবি। ভাবুন তো আট বছর বয়সের একজন বিপ্লবী! ১৮৬৩ সালে ওর বয়স ছিলো আট। পোল্যান্ড ঐ বছর রাশিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো। টুসি এঙ্গেলসের কাছে একটা চিঠি লিখলো, আমরা ওকে টুসি ডাকতাম, বিষয়, ‘পোল্যান্ডের সেই সাহসী সৈনিকেরা। নয় বছর বয়সে ও যুদ্ধে জেতার ব্যাপারে কিছু পরামর্শ দিয়ে প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের কাছে চিঠি লিখে পাঠালো।

সে এমনকি ঐ শিশু বয়সেই তামাক খেতো, ওয়াইনে চুমুক দিতো। ভাবুন একবার এলিয়েনর ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে পুতুলকে জামা পরাচ্ছে। ওর যখন দশ বছর বয়স তখনি দাবা খেলায় ওকে হারাতে রীতিমতো আমার ঘাম ঝরাতে হতো। পনের বছর বয়সে ও হঠাৎ করে লর্ডস ডে পালনের বিরুদ্ধে মহা খাপ্পা হয়ে উঠলো। তখনকার দিনে রবিবারে কোন কাজ-কর্ম, কোন ধরণের অনুষ্ঠান করা ছিলো নিষিদ্ধ। এলিয়েনর করলো কী-সেইন্ট মার্টিন হলে ‘জনগণের জন্য রবিবারের সন্ধা’আয়োজন করে ফেললো। গাইয়ে-বাজিয়ের ব্যাবস্থা হয়ে গেল। হল রুম কানায় কানায় ভর্তি। দুই হাজার লোক। পুরো ব্যাপারটাই আইনে নিষিদ্ধ কিন্তু একজনও গ্রেপ্তার হলো না। এটা একটা শিক্ষা। আইন যদি ভাংতে হয় তাহলে অন্ত:ত দুই হাজার লোক নিয়ে ভাংবেন আর সঙ্গে যেন গান থাকে।

টুসি, মানে আমাদের এলিয়েনর আর ওর বোনদের সামনে আমি জোরে জোরে শেক্সপিয়ার আর এস্কাইলাস পড়তাম। এই দু’জনের নাটক ওর খুব প্রিয় ছিলো। ওর ঘরটা ছিলো শেক্সপিয়ার মিউজিয়াম। রোমিও এন্ড জুলিয়েট নাটক ওর পুরোটা মুখস্থ ছিলো। রোমিও যখন জুলিয়েটকে প্রথমবার দেখলো-ঐ জায়গাটা সে আমাকে দিয়ে বার বার পড়াতো:

The brightness of her cheek would shame those stars,
As daylight doth a lamp; her eyes in heaven
Would through the airy region stream so bright
That birds would sing and think i were not night.
 

তবে টুসির সঙ্গে থাকাটা সহজ কাজ ছিলো না। যে বাচ্চা আপনার প্রতিটা যুক্তির ভুল ধরে তাকে বড় করা-ভাবুন তো কতটা কঠিন। ও আমার লেখা নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করতো। যেমন আমার একটা লেখা আছে, নাম ‘ইহুদি প্রশ্নে।’লেখাটা বোঝা বেশ কঠিন, আমিও স্বীকার করি। তো এলিয়েনর লেখাটা পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে আমায় চ্যালেঞ্জ করলো, ‘কেন তুমি পুঁজিবাদের প্রতিনিধি হিসেবে ইহুদিদের নজির দিলে। বাণিজ্য আর লোভের বিষে আর সবাই জর্জরিত।’

আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম, আমি ইহুদিদের আলাদা করে কিছু বলিনি, এটা স্রেফ একটা দৃষ্টান্ত। এর উত্তরে ও ইহুদিদের প্রতিক জিয়ুশ স্টার পরে ঘোরা শুরু করলো। ঘোষণা দিলো ‘আমি এখন থেকে ইহুদি।’কী বলবো, আমি তো হতবাক। আমি শুনে কাঁধ ঝাকালাম। এলিয়েনর বলে উঠলো, ‘এটা খাঁটি ইহুদিদের মত অঙ্গভঙ্গি।’মহা ঝামেলা।

টুসি জানতো আমার বাবা ছিলেন ধর্মান্তরিত খৃষ্টান। তখন জার্মানিতে ইহুদি থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ ছিলোনা... ইহুদি থাকাটা আসলে কোথাও বুদ্ধিমানের কাজ না। আট বছর বয়সে আমাকে ব্যাপটাইজড করা হয়েছিলো। এটাতে এলিয়েনরের ধোকা লাগলো, ও বললো, ‘মুর’- আমার শ্যামলা গায়ের রঙের কারণে পরিবারে আমাকে মুর বলে ডাকা হতো-আমি যদ্দুর জানি তোমাকে ব্যাপ্টাইজড করা হয়েছিলো। তার আগেই তো তোমার খতনা করা হয়েছিলো, ঠিক না?’মেয়েটার মুখে কিছু আটকাতো না।

মাথায় কিছু ঢুকলে ওকে সামলানো মুশকিল। এবার দেখি জিয়ুশ স্টারের পাশাপাশি ও ক্রুশ পরা শুরু করেছে। খৃষ্টান ধর্ম নিয়ে ওর কোন মাথা ব্যাথা ছিলো না। কিন্তু যিশুর নাম নিয়ে আইরিশদের মুক্তি সংগ্রাম-তাদের সম্মানেই ওর এই কাণ্ড। আইরিশ মুক্তি সংগ্রামের কথা টুসি জানতে পারে লিযি বার্নের কাছ থেকে। লিযি ছিলো এঙ্গেলসের প্রেমিকা।

লিযি ছিলো কারখানার শ্রমিক, পড়তে পারতোনা। আর এঙ্গলস নয়টা ভাষায় কথা বলতে পারতো। আপনারা হয়তো ভাবছেন-ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতো কেমন করে! না, সমস্যা হতো না, কারণ ওরা একে অপরকে ভালোবাসতো। লিযি ছিলো আইরিশ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। টুসি প্রায়ই লিযির কাছে যেতো, মেঝেতে বসে দুজনে মিলে ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত আইরিশ গান গাইতো।

এক সন্ধ্যা বেলা, আমাদের সোহো এলাকাতেই ইংরেজ সরকার দুজন তরুণ আইরিশ মুক্তি সংগ্রামীকে ফাঁসিতে ঝোলালো। সামনে শত শত মাতাল ফুর্তিতে চিৎকার করছে। আপনারা বোধ হয় এই কাজই এখন আরো সভ্য ভাবে করেন। শুধু স্বাধীনতা চাওয়ার অপরাধে ঐ দুই জনকে ফাঁসি দেয়া হলো। এলিয়নরের কান্না আর থামানো যায় না।

আমি বললাম, ‘টুসি তোমার বয়স মাত্র পনের। এখনই তোমার পৃথিবীর নিষ্ঠুর জিনিসগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় হয়নি।’ও বললো, ‘ঠিক এইটাই ব্যাপার মুর। আমার বয়স তের না চৌদ্দ না। আমার বয়স পনের।’

ওর বয়স তো তখন আসলেও পনের। আমাদের ঘরে সুদর্শন কোন পুরুষ এলে সে দূর্বল হয়ে পড়তো। আমি এর একটা তালিকা তৈরি করতে পারি। সারাটা জীবন আমার এই মেয়েটা রাজনীতিতে ছিল অসাধারণ বুদ্ধিমতি, প্রেমের ব্যাপারে একটা বোকা। পারি কমিউনের হিরো লিসাগ্রের ছিলো ও মারাত্বক ভক্ত। তাও ভালো, লোকটা অন্ত:ত ফরাসি ছিলো।

জেনিচেনের প্রেমিক ছিলো ইংরেজ। ইংরেজ মানুষ তাদের খাবারের মতই পানসে। আর কিছু বলতে হবে? আর ছিলো লরা’র প্রেমিক লা ফার্গ যার কান্ড জ্ঞান বলতে কিছু নেই। সবার সামনে নাকের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে বসে আছে, যেন এর চাইতে স্বাভাবিক ব্যাপার আর নেই। জেনি আমাকে বোঝাতো, ‘তুমি তো জানো ওর পরিবার কিউবা থেকে ফ্রান্সে এসেছে।’যেন কিউবাতে সবাই নাকের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে বসে থাকে।

(দীর্ঘশ্বাস) জেনি সব সময় আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করতো। হয়তো পারতোও। তবে আমার পিঠের ফোড়া বেচারি সারাতে পারেনি। (মুখে তিক্ততার ছাপ) আপনার পিঠে কখনো একসাথে কয়েকটা ফোড়া উঠেছে কখনো? এর চেয়ে কুৎসিত অসুখ আর হয় না। আমার জীবন দূর্বিসহ করে দিয়েছে। কিছু সমালোচক এইটাকেই পুঁজি করে ব্যাখ্যা করলেন, ‘পুঁজিবাদের ওপারে মার্ক্সের ক্রোধের কারণ তাঁর পিঠের ফোড়া।’আরে মাথা মোটার দল! যে সব বিপ্লবীদের ফোড়া হয়নি তাদের বেলায় কী?

অবশ্য ওদের অজুহাতের অভাব নেই। অমুককে তাঁর বাবা ছোট বেলায় পেটাতো, তমুক তাঁর মায়ের আদর পায়নি। মানে সৃষ্টি ছাড়া না হলে কেউ শোষনের প্রতিবাদ করে না। সব ব্যাখ্যা আপনি ওদের কাছে পাবেন। পুঁজিবাদ স্বভাব বশেই মানুষের অন্তর ছিবড়ে বানিয়ে ফেলে-ফলে বিদ্রোহ তো হবেই- এই স্পষ্ট সহজ ব্যাখ্যাটাই তারা শুধু পাশ কাটিয়ে যান।

ও হ্যাঁ, তারা তো বলে পুঁজিবাদ নাকি আমার কালের চাইতে অনেক মানবিক হয়েছে। তাই না কি? মাত্র কয়েক দিন আগে, আপনাদের দেশেই তাজরিন নামে একটা পোষাক কারখানা মালিক গেটে তালা মেরে রেখেছিলো। কেন? মুনাফা, আরো বেশি মুনাফা। আগুন লাগলো আর ১১২ জন শ্রমিক জ্যান্ত পুড়ে কয়লা হলো।

আমার ক্রোধ হয়তো ফোড়াগুলোর যন্ত্রণা বাড়াতো। কিন্তু পিঠের মধ্যে ফোড়া নিয়ে দিনে ষোল ঘণ্টা লেখা-লেখির চেষ্টা করে দেখুন তো কেমন লাগে। আর ডাক্তার? ফোড়া তো উঠেছে আমার ওরা আমার চাইতে বেশি জানবে কী করে। (এক চুমুক বিয়ার)

আমি ঘুমাতে পারতাম না। তখন একটা অদ্ভুত ঔষুধ আবিষ্কার করলাম-পানি। হ্যা শুধু পানি। গরম পানিতে ভেজানো কাপর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেনি আমার ফোড়ার ওপর গরম ভেজা কাপর দিতো, আর আমি লিখতাম। মাঝ রাতে ব্যাথায় চিৎকার করে উঠলে জেনি ছুটে আসতো সেই ভেজা কাপড় নিয়ে। জেনি কখনো ক্লান্ত হয়ে ঘুমোতে গেলে সামাল দিতো লিনচেন।

(স্মৃতিতে ডুব দিয়ে থামলেন) হ্যাঁ লিনচেন, আমরা যখন সোহোতে আপাদ-মস্তক অভাবে ডুবে আছি, বাচ্চাদের দেখা-শোনা করতে জেনির মা লিনচেনকে পাঠালেন। আমরা ঘরের আসবাবপত্র বন্ধক দিয়ে বসে আছি আর এমন সময় হঠাৎ উপহার হিসেবে শ্বশুর বাড়ি থেকে গৃহপরিচারিকা! অভিজাত পরিবারে বিয়ে করলে এই হয়। আপনার যখন হাতে একটা পয়সা নেই, শ্বশুর বাড়ি থেকে উপহার আসবে দামি সিল্কের জামা, রুপোর বাসন-পত্র, আর গৃহ পরিচারিকা। ব্যাপারটা মন্দ না। গৃহ পরিচারিকা তাহলে সিল্কের জামা, রুপোর বাসন বন্ধক দিয়ে টাকা আনতে পারে। লিনচেন এই কাজ বহুবার করেছে। তবে সে কখনোই কাজের মেয়ে ছিলোনা। বাচ্চারা ওকে মায়ের মতো সম্মান করতো। ওর প্রতি জেনির ভালোবাসা ছিলো সীমাহীন। জেনি যখন অসুস্থ ছিলো, লিনচেন পুরো ঘর সামলাতো।

তবে ওর উপস্থিতি আমার আর জেনির মাঝে একটা টানা-পোড়েন সৃষ্টি করলো। আমার মনে পড়ে, জেনি একবার বললো, ‘আজ সকালে লক্ষ্য করলাম তুমি লিনচেনের দিকে তাকিয়ে আছো?’

‘তাকিয়ে ছিলাম? মানে, কী?

‘মানে, একজন পুরুষ যেমন করে মেয়েদের দিকে তাকায়।’

‘আমি এখনো তোমার কথার মানে বুঝতে পারছি না’, (দুঃখ নিয়ে মাথা নাড়লেন) এই আলাপের কী কোন ফয়সালা হয়?

ডিন স্ট্রিটে আমাদের ঘরে এভাবেই জীবন চলছিলো। আর বাইরে লন্ডনের কোলাহল। কেমন ছিল ১৮৫৮ সালের লন্ডনের রাস্তা? খাবার ফেরি করা মেয়েরা ক’টা পয়সা রোজগারের জন্য সেধে বেড়াচ্ছে। বাজনা হাতে বাদরওয়ালা, বেশ্যা, জাদুকর, ফুটপাতের দোকানদারের কান ঝালা-পালা করা চিৎকার, স্কটিশ পাইপার, বেহালবাদক আর সব সময় একটা ভিক্ষুক মেয়ে আইরিশ পালা গান গেয়ে ভিক্ষা করছে। সন্ধায় রাস্তায় গ্যাসের বাতি জ্বলে উঠতো, তার নিচ দিয়ে এইসব দেখতে দেখতে আমি হেটে হেটে ডিন স্ট্রিটে আমাদের বাসায় ফিরতাম। পথ ভর্তি কাদা আর আবর্জনা, আমি দেখতাম আর ভাবতাম পাশের ধনীদের রাস্তাগুলো ঝকঝকে পরিষ্কার রাখতে ওরা কী কষ্টটাই না করে। (দীর্ঘশ্বাস) যাক, আমি ভাবতাম যে মানুষ ডাস কাপিটেল লিখে পুঁজিবাদি ব্যাবস্থার শেষ দন্ড ঘোষণা করছে, তাকে তো এই ময়লা আবর্জনার মধ্য দিয়েই পথ চলতে হবে...

জেনি কিন্তু আমার অনুযোগে কখনও সহানুভূতি দেখাতো না। বলতো, ‘ডাস ক্যাপিটেল পড়তে গেলে আমারও ঠিক এই রকম অনুভূতি হয়।’জেনি ছিল আমার সবচাইতে তীব্র সমালোচক। কোন ছাড় দিতো না। বলতে পারেন সৎ সমালোচক। আর একজন সৎ সমালোচক তো উদ্ধত হবেই।

বইটা নিয়ে ও খুব দুশ্চিন্তায় থাকতো। হ্যাঁ ডাস কাপিটেল নিয়ে (বইটা তুলে নেবেন) বইয়ের শুরুতে আমি যে পণ্য, ব্যাবহার মূল্য, বিনিময় মূল্য এসব নিয়ে আলোচনা করেছি, ও ভয় পেতো পাঠক এতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। বলতো বইটা খুব বেশি বড়, বেশি খুটিনাটিতে ভর্তি। ও বলতো বইটা অপাঠ্য, ভাবুন একবার!

ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী আমাদের বন্ধু পিটার ফক্সকে আমি বইটার একটা কপি উপহার দিয়েছিলাম, ফক্স উপহার পেয়ে বললো, ‘মনে হচ্ছে কেউ আমাকে একটা হাতি উপহার দিয়েছে।’জেনি আমাকে এই কথা স্মরণ করিয়ে দিতো।

জেনি যখন বলতো বইটা হাতির মতো, আমি বলার চেষ্টা করতাম - দেখো এটা তো কমিউনিস্ট ইশতেহার না, ইশতেহার লেখা হয়েছিলো আম-জনতার জন্য। ক্যাপিটেল একটা বিশ্লেষণ।

‘হোক বিশ্লেষণ,’ও বলতো,‘কিন্তু এতে ইশতেহারের মতো সেই তীব্র চিৎকার থাকলে সমস্যা কী?’

‘ইউরোপ ভুত দেখেছে-কমিউনিজমের ভুত। হ্যাঁ, ঠিক এমন কথা পাঠককে আন্দোলিত করবে... ইউরোপ ভুত দেখেছে।

এর পরেই জেনি আমাকে ডাস ক্যাপিটেলের প্রথম বাক্যটা পড়ে শোনাতো আমাকে খোচানোর জন্য। (টেবিল থেকে বইটা তুলে নিয়ে পড়বেন)‘যে সব সমাজে পুজিতান্ত্রিক উৎপাদন ধরন বিরাজ করে তারা নিজেকে উপস্থাপিত করে পণ্যের এক বিপুল সঞ্চয়ন হিসেবে।’

ও বলতো, ‘পাঠক তো এই লেখা পড়তে গেলে ঘুমিয়ে পড়বে।’

আচ্ছা আপনাদের কী মনে হয়, বইটা একঘেয়ে?(ভাববেন) হয়তো আসলেও একটু একঘেয়ে, আমি জেনির কাছে স্বীকার করতাম। জেনি বলতো, ‘একটু একঘেয়ে বলতে কিছু নেই।’

ভুল বুঝবেন না, ও ডাস ক্যাপিটেলকে একটা গভীর বিশ্লেষণ বলেই মনে করতো। এই বইটা দেখিয়েছে সে ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়ে কেমন করে পুঁজিতান্ত্রিক পদ্ধতি জন্ম নিয়ে উৎপাদনি শক্তির অতিকায় বৃদ্ধি ঘটায়, পৃথিবীর সম্পদে অতুলনীয় সম্পদ জমা করে। আর তারপর কেমন করে নিজ স্বভাবেই সে এমনভাবে সেই সম্পদ বিতরণ করে যার ফলে শ্রমিক ও পুঁজিপতি দুই পক্ষেরই মানবিক গুণ হয়ে যায়। আর এই স্বভাবের কারণেই কেমন করে তা নিজের কবর খননকারীর জন্ম দিতে বাধ্য হয়, আরো মানবিক ব্যবস্থার জন্য পথ ছেড়ে দেয়।

কিন্তু জেনি সব সময় বলতো,‘আমরা যাদের কাছে পৌঁছোতে চাচ্ছি, তাদের কাছে কি পৌঁছানো যাচ্ছে?’

একদিন ও আমাকে বললো,‘তুমি জানো কেন সেন্সর এই বইটা ছাপার অনুমতি দিয়েছে? কারণ ওরা নিজেরা পড়ে কিছু বুঝতে পারেনি আর ধরে নিয়েছে আর কেউ বুঝবেনা।’

আমি মনে করিয়ে দিলাম ডাস ক্যাপিটেল বেশ ভালো রিভিউ পাচ্ছে। ও আমাকে পাল্টা মনে করিয়ে দিলো রিভিউগুলো ছদ্মনামে এঙ্গেলসেরই লেখা... আমি বললাম-তুমি আমার সঙ্গে সুখী নও বলেই হয়তো আমার কাজের এতো সমালোচনা কর।

জেনি বললো, ‘তুমি আসলে মানতেই পারো না যে তোমার কাজের সমালোচনা হতে পারে, আর তাই এখন ব্যক্তিগত আক্রমণ করছো। মুর, এতে আমার ব্যক্তি অনুভূতি আছে সত্যি, কিন্তু সেটা ভিন্ন ব্যাপার।’

হ্যাঁ, ওর ব্যক্তিগত অনুভূতি। জেনির তখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছিলো। মনে হয় আমিও এর জন্য কিছুটা দায়ী ছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করে ওর কষ্ট কমাই। আপনাদের বুঝতে হবে আমরা যখন প্রেমে পড়ি তখন আমার বয়স সতের। জেনির উনিশ। সে ছিল অসাধারণ সুন্দরী, খয়েরি চুল কালো চোখ। কী কারণে যেন ওর পরিবার আমাকে পছন্দ করতো। ওরা ছিলো অভিজাত। অভিজাতরা সব সময় ইন্টেলেকচুয়ালদের পছন্দ করে। জেনির বাবা আর আমি গ্রীক দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতাম। আমার ডক্টরাল থিসিসের বিষয়ও ছিলো ডেমোক্রিটাস আর এপিকিউরাস। তখনই আমি বুঝতে শুরু করেছি যে দার্শনিকরা কেবল জগতটাকে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাপারটা হচ্ছে একে বদলানো।

যখন আমি জার্মানি থেকে বহিষ্কৃত হলাম, জেনিও প্যারিসে চলে এলো। আমরা বিয়ে করলাম, জেনিচেন আর লরার জন্ম হল। পকেট ফাকা তবু বন্ধুদের সঙ্গে আমরা সুখে ছিলাম। ওদেরও পকেট ফাকা। সে এক অদ্ভুত জমায়েত। বিপুলদেহী নৈরাজ্যবাদি বাকুনিন, সুদর্শন নিরীশ্বরবাদী এঙ্গেলস, সাধু কবি হেইন, আগাগোড়া বেখাপ্পা স্টার্নার। আর প্রুধো, যিনি বলেছিলেন - সম্পত্তি মানে চুরি। তবে নিজের কিছুটা থাকলে মন্দ হয় না।

প্যারিসে দরিদ্র থাকা এক জিনিষ। লন্ডনে দারিদ্র আরেক ব্যাপার। লন্ডনে আমরা এলাম দুই সন্তানসহ, জেনি আবার সন্তানসম্ভবা হল। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো... ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে একটা ঘরে, যেখানে সব সময় কেউ না কেউ অসুস্থ - এমন জায়গায় আমাদের সন্তানদের থাকতে হচ্ছে বলে ও আমায় অপরাধী মনে করছে।

জেনির গুটি বসন্ত হল। সেরে ওঠার পর মুখে কয়েকটা দাগ রয়ে গেল। আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম-তুমি আগের মতই সুন্দর আছো। লাভ হলো না।

আপনারা যদি জেনিকে জানতেন। ও আমার জন্য যা করেছে তার কোন হিসেব হয় না। আমি আর সবার মতো চাকরি করতে পারবোনা-এই সত্যটা ও মেনে নিয়েছিলো। আমি অবশ্য একবার চাকরির চেষ্টা করেছিলাম। রেলওয়েতে কেরানির চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। ওরা উত্তর দিলো, ‘ডক্টর মার্ক্স, আপনি আমাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। আমাদের এখানে ডক্টরেট কেউ এর আগে কেরানির পদে কাজ করেনি। তবে এ কাজের জন্য এমন একজন লোক প্রয়োজন যার হাতের লেখা পড়া যায়। ফলে আমরা দুঃখের সঙ্গে আপনার আবেদন খারিজ করছি।’(কাধ-ঝাকাবেন)

জেনি আমার মত বিশ্বাস করতো। তবে ওর ভাষায় ‘উচু স্তরের পান্ডিত্য’জিনিষটা ও সইতে পারতো না। সে প্রায়ই বলতো ‘ডক্টর মার্ক্স, দয়া করে জমিনে পা রাখো।’

ও চাইতো আমি এমনভাবে উদ্ধৃত্ত মূল্য তত্ত্ব এমনভাবে ব্যাখ্যা করি যেন সাধারণ শ্রমিকও তা বুঝতে পারে। আমি বললাম, ‘কিন্তু তার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে মূল্যের শ্রম তত্ত্ব, বুঝতে হবে শ্রম শক্তি এমন একটা বিশেষ পণ্য যার মূল্য রুজি-রোজগারের উপাদানের দামের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং তার পরও যা অন্য সব পণ্যের মূল্য প্রদান করে। আর এই মূল্য সর্বদাই শ্রম শক্তির মূল্যের চাইতে বেশি হয়।’

জেনি মাথা নাড়তো, ‘উহুঁ, এভাবে হবে না। তোমাকে শুধু বলতে হবে - আপনাদের নিয়োগ কর্তারা যৎসামান্য মজুরি দেয়, যতটা হলে আপনারা কোন মতে বেঁচে থেকে তাদের জন্য কাজ করতে পারবেন। কিন্তু আপনাদের তারা যা দেয় আপনাদেরই শ্রমে তার থেকে অনেক অনেক বেশি লাভ করে। আর এভাবে তারা ধনী থেকে আরো ধনী হয়, আপনারা গরিবই থেকে যান।’

ঠিক আছে, ধরে নিলাম পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে একশো জন আমার উদ্ধৃত্ত মূল্য তত্ত্ব বুঝতে পেরেছে। (ক্রোধ) তার পরো এটা সত্য। এইতো গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের প্রতিবেদন পড়ছিলাম। এই যে। শ্রমিকেরা ক্রমাগত আরো বেশি পণ্য উৎপাদন করছে আর সেই অনুপাতে তাদের মজুরি ক্রামাগত কমছে। ফলাফল? ঠিক আমি যেমন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম। এখন আমেরিকার ধনী এক পার্সেন্ট মানুষ পুরো দেশের চল্লিশ শতাংশ সম্পদের মালিক। ফল অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন। যে দেশটা শুধু নিজের জনগণকে লুট করেছে তাই নয় বাকি দুনিয়ার সম্পদও শোষণ করেছে-সেই দেশটাই বিশ্ব পুঁজিবাদের সর্বোত্তম আদর্শ!...

তত্ত্বগুলো স্বভাবতঃই জটিল। জেনি সব সময় সেগুলো সহজ করার চেষ্টা করতো। ও বলতো-‘তুমি প্রথমে পণ্ডিত তারপর বিপ্লবী। তোমার পণ্ডিত পাঠকদের কথা ভুলে যাও, শ্রমিকদের জন্য লেখো।’

ও আমাকে তীব্রভাবে বলতো উদ্ধত,অসহিষ্ণু। ‘আচ্ছা কেন তোমরা বুর্জোয়াদের চাইতে অন্য বিপ্লবীদের আরো তীব্রভাবে আক্রমণ করো?’- জেনি প্রশ্ন করতো।

যেমন প্রুধো। লোকটা বুঝতে পারতো না যে প্রথমে আমাদের অবশ্যই পুঁজিবাদ যে শিল্প গড়ে তুলেছে তাকে স্বাগত জানাতে হবে, তারপর সেগুলো দখল করতে হবে। প্রুধো ভাবতেন আমাদের আরো সরল সমাজে ফিরে যেতে হবে। উনি একটা বই লিখলেন, নাম ‘দারিদ্রের দর্শন’, আমি পাল্টা আরেকটা বই লিখলাম ‘দর্শনের দারিদ্র’। মনে হলো, বাহ, বেশ হয়েছে। জেনি বললো এটা অপমানজনক। (দীর্ঘশ্বাস) আমার মনে হয় মানুষ হিসেবে জেনি আমার চাইতে বহুগুণ ভালো।

ও আমাকে লন্ডনের শ্রমিকদের জন্য কাজ করতে উৎসাহ জোগাতো। আন্তর্জাতিক শ্রমিক এসোসিয়েশনের প্রথম সভায় আমাকে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ করা হলো। জেনি আমার সঙ্গে এলো। ১৮৬৪ সালের শেষ দিকে। সেইন্ট মার্টিন হল কানায় কানায় ভরা, দুই হাজার শ্রমিক। (সামনে এগিয়ে আবেগের সাথে দৃঢ়ভাবে বলবেন, দুই হাত মেলে, যেন সামনে বিশাল জনসমাগম)।

‘যে সব বিদেশীনীতি জাতীয় মূল্যবোধ নিয়ে খেলা করে, যুদ্ধে জনগণের রক্ত আর সম্পদ নিয়ে হোলি খেলে- সব দেশের শ্রমিকদের তা রুখে দিতে এক হতে হবে। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোতে নৈতিকতা আর ন্যায্যতার সরল আইন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তারজন্য দেশের সীমানা পার হয়ে আমাদের এক হতে হবে... দুনিয়ার মজদুর এক হও’। (থামবেন)

এবার জেনির পছন্দ হল। .... (এক চুমুক বিয়ার)

আমাদের পরিবারটা জেনিই ধরে রেখেছিলো-পানির লাইন কাটা, গ্যাসের লাইন কাটা... তবে নারী মুক্তি নিয়ে ও কোন ছাড় দিতো না। বলতো এই ঘরে আটকে থেকে হাড়ি-কুড়ি সামলাতে সামলাতে মেয়েদের সব সম্ভাবনা শেষ হলো। জেনি তাই ঘরে বসে থাকতে অস্বীকার করলো।

জেনি বলতো আমি তাত্ত্বিকভাবে নারী মুক্তির কথা বললেও বাস্তবে নারীদের সমস্যা নিয়ে কিছু জানি না। ও বলতো, ‘তুমি আর এঙ্গেলস নারী-পুরুষের সমতার কথা বললেও বাস্তবে তার চর্চা করো না।’যাক, আমি এই বিষয়ে কিছু বলবো না।

ও সর্বান্তকরণে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আইরিশদের মুক্তি সংগ্রাম সমর্থন করতো। রাণী ভিক্টোরিয়া বলেছিলেন, ‘আইরিশরা অন্যান্য সভ্য জাতির মত নয়, এরা একেবারে অসভ্য একটা জাতি। জেনি লন্ডনের পত্রিকায় লিখলো, ‘শুধুমাত্র স্বাধীনতা চাওয়ার অপরাধে আইরিশ বিদ্রোহীদের ইংল্যান্ড ফাঁসিতে ঝোলায়। ইংল্যান্ড কী সভ্য?’

জেনি আর আমার ভালোবাসা ছিলো কতোটা তীব্র...আপনাদের কেমন করে বোঝাই? কিন্তু লন্ডন আমাদের কাছে ছিল নরকের মতো। আমাদের প্রেম অটুট ছিল। কিন্তু একটা সময় কী যে হলো... আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। জেনি বললো যে এর কারণ সে আর আগের মতো সুন্দরী নেই, আমি সে সুন্দরের পুজা করতাম। আমি রেগে গেলাম। জেনি বললো এর পেছনের কারণ লিনচেন। আমার মাথায় আগুন ধরে গেল। ও বললো আমি রেগে যাচ্ছি কারণ কথাটা সত্যি। আমি এবার রাগে ফেটে পড়লাম।

(দীর্ঘশ্বাস, এক চুমুক বিয়ার, টেবিলের পত্রিকাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা তুলে নেবেন) ওরা বলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে তাই কমিউনিজম মৃত। (মাথা নাড়বেন) এই বেকুবগুলো কি জানে কমিউনিজম কী? ওরা কি মনে করে, যে ঠগগুলো সহযোদ্ধা বিপ্লবীদের খুন করে তাদের হাতে চালানো ব্যাবস্থার নাম কমিউনিজম? মাথা মোটার দল।

আচ্ছা, সেসব সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এমন সব কথা বলে ওরা পড়া-লেখা করেছে কোথায়? ওরা কি কখনো কমিউনিস্ট ইশতেহার পড়েছে যেটা লেখার সময় এঙ্গলসের বয়স ছিল আটাশ আর আমার তিরিশ।

(এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে বই তুলে পড়বেন) ‘শ্রেণি ও শ্রেণিবিরোধের এই পুরোনো বুর্জোয়া সমাজের স্থান নেবে এক সংঘ যেখানে প্রত্যেকটি লোকের স্বাধীন বিকাশ হবে সকলের স্বাধীন বিকাশের শর্ত,’শুনলেন আমি কী পড়লাম? হ্যাঁ সংঘ ! ওরা কী কমিউনিজমের উদ্দেশ্য বোঝে? ব্যাক্তির মুক্তি, নিজেকে মমতাময় মানুষ হিসেবে বিকশিত করা। ওরা কী মনে করে যে দূর্বৃত্তগুলো নিজেকে কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী বলে দাবী করে ওরা জানে কমিউনিজম কী?

মতে না মিললে গুলি করে দাও-আমি এমন কমিউনিজমের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করেছি? এইযে দানবগুলো রাশিয়াতে সব ক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নিলো, ধর্মান্ধের মত আমার চিন্তার ব্যাখ্যা করলো, নিজের কমরেডদেরকে দেয়ালের সামনে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করালো-এরা কী তাদের নাগরিকদেরকে নিউইয়র্ক ট্রিবিউনে আমার লেখা চিঠিটা পড়ার অনুমতি দিয়েছিলো? আমি তাতে লিখেছিলাম, নিজেকে সভ্য দাবী করলে কোন সমাজ মৃত্যুদণ্ডের অনুমতি দিতে পারে না... (ক্রোধ) পুঁজিবাদের নির্বুদ্ধিতাগুলো সমাজতন্ত্রে কোন মতেই ঠাই পেতে পারে না।

এই যে আপনাদের দেশে জেলখানাগুলো ভর্তি হয়ে আছে। কারা আছে জেলখানায়? গরীব মানুষ। তাদের কেউ কেউ ভয়ানক অপরাধ করেছে। তাদের অধিকাংশই ছিচকে চোর, ডাকাত, মাদক ব্যসায়ী। এরা সবাই স্বাধীন ব্যাবসায় বিশ্বাসী। পুঁজিবাদিরা যা করে এরাও তাই করেছে, তবে অনেক ছোট আকারে।

(আরেকটা বই তুলে নেবেন) আমি আর এঙ্গলস জেলখানা নিয়ে কী লিখেছিলাম জানেন?

‘ব্যাক্তিকে তার অপরাধের জন্য শস্তি দেয়ার বদলে আমাদের উচিত যে সামাজিক পরিবেশ অপরাধ জন্ম দেয় তাকে ধ্বংস করা, আর নিজ জীবনকে বিকশিত করতে প্রতিটি ব্যাক্তির সমাজে যে সুযোগ দরকার তা নিশ্চিত করা।’

হ্যাঁ, আমরা সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের কথা বলেছি, কোন পার্টির, কেন্দ্রীয় কমিটির বা কোন ব্যাক্তির এক নায়কতন্ত্রের কথা বলিনি। আমরা শ্রমিকশ্রেণীর সাময়িক একনায়কতন্ত্রের কথা বলেছি। জনসাধারণ রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নিয়ে সবার স্বার্থে শাসন চালাবে যতক্ষণ খোদ রাষ্ট্রটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে ক্রমে মিলিয়ে না যায়।

বাকুনিন অবশ্য এতে আপত্তি তুলেছিল। নৈরাজ্যবাদি বাকুলিন। তাঁর মতে এমন কি শ্রমিক রাষ্ট্রের হাতেও যদি আর্মি, পুলিশ, জেলখানা থাকে তাহলে সেও স্বৈরাচারি হতে বাধ্য। ভালো কথা, বাকুনিনের ব্যাপারে আপনাদের জানা আছে তো? কোন উপন্যাসে এরকম চরিত্রের কথা পড়লে আপনারা বলতেন-বাস্তবে এমন সম্ভব না। আমাদের দুজনের মতে মিলতো না- শুধু এটুকু বললে ব্যাপারটা ঠিক বুঝবেন না।

এঙ্গেলস আর আমি যখন ব্রাসেলসে ইশতেহার লিখছি তখন বাকুনিন আমাদের নিয়ে কী বলেছিলো শুনবেন (টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে পড়বেন), মার্ক্স এবং এঙ্গেলস, বিশেষ করে মার্ক্স একেবারে সাচ্চা বুর্জোয়া।’

আমরা সাচ্চা বুর্জোয়া! অবশ্য বাকুনিনের তুলনায় সবাই বুর্জোয়া। কারণ বাকুনিন আস্তাবলের নোংরা জায়গাতে থাকতেই পছন্দ করতো। আপনিও যদি তা না করেন যদি আপনার মাথার ওপরে ছাদ থাকে, বসবার জন্য একটা পিয়ানো থাকে, যদি আপনি তাজা খাবার খান তাহলেই বাকুনিনের মতে আপনি বুর্জোয়া।

আমি লোকটার সাহসের প্রশংসা করি। বন্দী হয়ে সাইবেরিয়ায় গেল, পালিয়েও গেলো, বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য পুরো দুনিয়া চষে বেড়ালো। সে চেয়েছিলো একটা নৈরাজ্যবাদি সমাজ। তবে একটা জায়গাতেই সে নৈরাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। সেটা হলো ওর মাথার ভেতর। ইতালির বোলোগনা’তে বিক্ষোভ সংগঠিত করতে গিয়ে নিজের পিস্তলের গুলিতে নিজেই মরতে বসেছিলো। তার বিপ্লব সব জায়গায় ব্যার্থ হয়েছিলো। তবে কিছু লোক আছেনা, প্রেমে ব্যর্থ হলে আরো ক্ষেপে নতুন উদ্যমে প্রেম শুরু করে-বাকুনিনের স্বভাব ছিলো ওরকম।

বাকুনিনের কোন ছবি দেখেছেন? দানবাকৃতির মানুষ, ন্যাড়া মাথায় ছোট একটা ছাই রঙের টুপি, বিশাল দাড়ি, আক্রমণাত্বক ভাব-ভঙ্গি। দীর্ঘ দিন জেলখানার খাবার খেয়ে অপুষ্টিতে স্কার্ভি হয়ে সব দাঁত পড়ে গেছে। ও যেন এই পৃথিবীতে বাস করতো না, নিজের কল্পনায় একটা পৃথিবী ছিলো ওর। টাকা পয়সার ব্যাপারে ভীষন উদাসীন। থাকলে বিলিয়ে দিতো, না থাকলে শোধ করার কথা না ভেবেই ধার করতো। ওর কোন ঘর-বাড়ি ছিলো না, অথবা বলতে পারেন পুরো পৃথিবীটাই ওর বাড়ি। কোন কমরেডের বাড়িতে আচমকা এসে ঘোষণা করতো-‘হাজির হলাম, ঘরে খাবার কী আছে? কোথায় ঘুমাবো? ’তারপর এক ঘণ্টার মধ্যে দেখা যেতো বাড়ির লোকদের চাইতে স্বাছন্দে ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে।’

সোহোতে একবার আমরা রাতে খেতে বসেছি, বাকুনিন দমকা হাওয়ার মতো ঘরে ঢুকলো। দরজায় টোকা দিয়ে আসার প্রশ্নই ওঠেনা। ওর অভ্যাস ছিলো খাওয়ার সময় এসে হাজির হওয়া। শুনেছিলাম সে ইতালিতে, আমরা তো ওকে দেখে অবাক। খবর নিলেই শুনতাম বাকুনিন দূর কোন দেশে বিপ্লব সংগঠিত করে বেড়াচ্ছে। যাক, ও এমন ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলো, দরজা কবজা খুলে পড়ার অবস্থা, ঘরে ঢুকেই অপেক্ষা না করে চেয়ার টেনে বসে গোগ্রাসে মাংস সসেজ খাওয়া শুরু করলো, সঙ্গে গ্লাসের পর গ্লাস ব্রান্ডি

আমি বললাম, ‘মিখাইল, ওয়াইনটা চেখে দেখো, অনেক আছে, ব্র্যান্ডির দাম বেশি।’

ও একটু ওয়াইন মুখে দিয়ে থু করে ফেলে দিলো, বললো, ‘একদম বিস্বাদ, ব্যান্ডি খেলে মাথা কাজ করে।’

এর পর শুরু হলো বাকুনিনের তামাশা - বক্তৃতা, তর্ক, আদেশ, চিৎকার।

আমরা তো রাগে মাথায় আগুন ধরে গেল। এমন সময় জেনি বলে উঠলো, ‘মিখাইল, থামো, ঘরের সব অক্সিজেন তো তুমি একলা শেষ করে ফেলছো।' বাকুনিন হা-হা করে হেসে উঠে আবার বক্তৃতাবাজি চালিয়ে গেলো।

বাকুনিনের মাথা ছিল নৈরাজ্যবাদি আবর্জনা, ফালতু সব কাল্পনিক চিন্তায় ভর্তি। আমি ওকে ইন্টারন্যাশনাল থেকে বহিষ্কার করতে চেয়েছিলাম। জেনির কাছে ব্যাপারটা অদ্ভূত মনে হলো। ও বললো তোমাদের বিপ্লবী দলে মানুষ যদি থাকে ছয়জন, তাহলে সব সময় এক আরেকজনকে বহিষ্কারেরর হুমকি দাও কেন?

বাকুনিন অসংখ্য ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো। কারণ ইউরোপের সব দেশে ওর নামে হুলিয়া জারি ছিলো। লন্ডনে আমাদের এখানে এলো পুরোহিতের ছদ্মবেশে, অন্ত:ত ওর তাই মনে হচ্ছিলো। ওকে কিম্ভুত দেখাচ্ছিলো।

যাক সেসব কথা। ও সেবারে আমাদের সঙ্গে রইলো এক সপ্তাহ। একদিন আমরা সারা রাত জেগে তর্ক করছি, পান করছি। তর্ক যত বাড়ে, পানের মাত্রা ততো বাড়ে। এক সময় দুজনের কারোর আর হাটবার মতো অবস্থা রইলো না। বাকুনিনের একটা জমকালো বক্তৃতার মাঝখানে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ‘আমার কথা এখনো শেষ হয়নি ’- বলে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ও আমাকে জাগিয়ে তুললো।

সময়টা ছিল ১৮৭১ সালের গৌরবময় সেই শীতকাল, প্যারিসে যখন কমিউন ক্ষমতা দখল করেছে। হ্যাঁ প্যারিস কমিউন। বাকুনিন তার বিশাল বপু নিয়ে সেই বিপ্লবে ঝাপিয়ে পড়লো। ফরাসিরা ওকে ভালো বুঝতে পেরেছিলো। ওরা বলতো - বিপ্লবের প্রথম দিনে বাকুনিন একটা সম্পদ, দ্বিতীয় দিনে ওকে গুলি করা ছাড়া উপায় নেই।

আপনারা কী মানব ইতিহাসের সেই অসাধারণ অধ্যায় -প্যারিস কমিউন সম্পর্কে জানেন? গল্প শুরু হয়েছিলো এক নির্বোধের মাধ্যমে। তৃতীয় নেপোলিয়নের কথা বলছি, বোনাপার্তের ভাইপো।

লোকটা ছিল একটা ভাড়। ফ্রান্সের দেড় কোটিরও বেশি কৃষক যখন অন্ধকার গুহায় বাস করে, তাদের সন্তান না খেয়ে মরছে, লোকটা তখন অভিনেতার মতো জনতার উদ্দেশ্যে হাসি মুখে হাত নাড়তো। কিন্তু যেহেতু তার একটা সংবিধান ছিলো, লোকেরা ভোট দিতো-ভাবা হতো যে দেশে গণতন্ত্র আছে। এই ভুলটা সবাই করে।

বোনাপার্তের গৌরব চাই, তাই সে বিসমার্কের সেনাবাহিনী আক্রমণ করার ভুলটা করে বসলো। বেচারা সহজেই হেরে গেলো, বিজয়ী জার্মান বাহিনী মার্চ করে প্যারিসে ঢুকে পড়লো। ওদের অভ্যর্থনা জানালো বন্দুকের চাইতে ভয়াবহ এক অস্ত্র-নীরবতা। প্যারিসের ভাস্কর্যগুলো সব কালো কাপড়ে ঢাকা, চারিদিকে এক বিশাল, অদৃশ্য, নীরব প্রতিরোধ। জার্মান বাহিনী বুদ্ধিমানের মতো মার্চ করে বিদায় নিলো।

পুরোনো শাসকরা প্যারিসে ঢোকার সাহস পেলো না। ওরা তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলো, কারণ জার্মানরা বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যারিস দখল করেছে শ্রমিক, গৃহবধু, কেরানি, বুদ্ধিজীবী, সশস্ত্র নাগরিকেরা। প্যারিসের জনগণ কোন সরকার গঠন করেনি, গঠন করেছে তারচে মহান কিছু, এমন কিছু যাকে সব সরকার ভয় পায়। যার নাম কমিউন, জনগণের সম্মিলিত শক্তি। এরই নাম ছিলো প্যারিস কমিউন।

জনগণ চব্বিশ ঘণ্টা জেগে আছে, ছোট ছোট দলে একসঙ্গে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, শহর ঘিরে রেখেছে ফরাসী সেনাবাহিনী, যে কোন মুহূর্তে দখল করে নেবে। প্যারিস হয়ে উঠলো পৃথিবীর প্রথম স্বাধীন নগরী। স্বৈরাশাসনের জগতে প্রথম স্বাধীন ভূখন্ড।

আমি বাকুনিনকে বললাম- ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র বলতে আমি কি বুঝিয়েছি জানতে চাও? প্যারিস কমিউনের দিকে তাকাও। এই হচ্ছে সত্যিকারের গণতন্ত্র। ইউরো, আমেরিকা বা আপনাদের দেশের গণতন্ত্র নয়, যেখানে নির্বাচন একটা তামাশা, যেখানে পুরোনো সমাজ ব্যবস্থার কাউকেই ভোট দিতে হয়, ভোটে যেই জিতুন, ধনীরাই দেশ শাসন করে।

প্যারিস কমিউন। টিকে ছিলো মাত্র কয়েক মাস। কিন্তু এটা ছিলো ইতিহাসের গরীব মানুষের প্রথম শাসন ব্যাবস্থা। এর আইন ছিলো গরীব মানুষের জন্য। গরীবের ঋণ মওকুফ হয়েছিলো, খাজনা মাফ হয়েছিলো, বন্ধকী দোকান তাদের মাল-সামান ফেরত দিয়েছিলো। ওরা কেউ শ্রমিকের চাইতে বেশি বেতন নিতে চাইলো না। শ্রমঘণ্টা কমিয়ে আনা হলো। সমস্ত থিয়েটার হলো সবার জন্য উন্মুক্ত।

ইউরোপ কাঁপানো চিত্রশিল্পী কুরবো নিজে হলেন শিল্পী সংঙ্ঘের সভাপ্রধান। সব জাদুঘর আবার খোলা হল। নারী শিক্ষার জন্য কমিশন গঠিত হলো। নারী শিক্ষা - ইতিহাসে এই কথা আগে কেউ শোনেনি। ওরা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো কাজে লাগালো। হালকা গ্যাস বেলুনে করে গ্রামাঞ্চলে ছাপানো কাগজ ফেলা হলো কৃষকদের মাঝে। তাতে লেখা সরল শক্তিশালী ছোট্ট একটা বার্তা-‘আমাদের স্বার্থ এক’। এই বার্তা আবার পৃথিবীর সব শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া দরকার।

কমিউন ঘোষণা করলো বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে-শিশুদের মানুষকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসতে শেখানো। শিক্ষা নিয়ে আপনাদের অন্তহীন আলোচনা আমি পড়ে দেখেছি। অর্থহীন সব বড় বড় কথা। পুঁজিবাদি দুনিয়ায় সফল হতে যা দরকার সব এখানে শেখানো হয়। কিন্তু ন্যায়ের জন্য তরুণদের সংগ্রামের কথা এরা ভুলেও উচ্চারণ করে না।

কমিউন এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলো। ওরা শুধু কথা নয়, কাজ দিয়েও শিক্ষা দিতো। বিপ্লবী অত্যাচারের যন্ত্র গিলোটিন ধ্বংস করা হল। অত্যাচার বিপ্লবী হলেও থামাতে হবে। তারপর মাথায় লাল ফিতা বেঁধে, হাতে বিশাল লাল পতাকা নিয়ে ওরা জমায়েত হলো সামরিক শক্তির প্রতিক ভেদম কলামের চারপাশে। এই স্তম্ভের মাথায় ছিলো নেপোলিয়ন বোনাপার্তের বিশাল এক মূর্তি। শহরের সব অট্টলিকার ওপরে উড়ছে লাল সিল্কের পতাকা। নেপোলিয়নের মাথায় দড়ি লাগানো হলো, হ্যাঁচকা টানে মূর্তির ধুলোয় গড়ালো। জনগণ ধ্বংস স্তুপের মাথায় লাল পতাকা ওড়ালো। এই ইমারত এখন আর কোন জাতির নয়, সমগ্র মানব জাতির। তার চারপাশে নারী পুরুষ, তাদের মুখে হাসি, চোখে জল।

হ্যাঁ, এই ছিল প্যারিস কমিউন। রাস্তায় মানুষের বিরাম নেই, সব সময় আলোচনা চলছে। ভাবনা চিন্তার দেয়া-নেয়া চলছে। মানুষ যখন-তখন হাসছে, চার দিকে ভালোবাসার শাসন। রাস্তা-ঘাট নিরাপদ, অথচ কোথাও কোন পুলিশ নেই। হ্য্যাঁ, এই হচ্ছে সমাজতন্ত্র।

অবশ্য এই উদাহরণ, মানে কমিউনের মতো উদাহরণ তো টিকে থাকতে দেয়া যায় না। অতএব রিপাবলিক সেনাবাহিনী প্যারিসে ঢুকে গণহত্যা চালালো। কমিউনের নেতাদের কবরস্থানের দেয়ালের সামনে দাঁর করিয়ে গুলি চালানো হলো। সব মিলিয়ে তিরিশ হাজার মানুষ হত্যা করা হলো।

বর্বর জানোয়াদের হাতে কমিউন চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো। এই কমিউন আমাদের কালের সবচে গৌরবময় অর্জন... (হাটবেন, কয়েক ঢোক বিয়ার)

বাকুনিন আর আমি পান করছিলাম, তর্ক চলছিলো, তর্ক বাড়তে লাগলো, আমি বললাম, ‘মিখাইল, তুমি সর্বহারার রাষ্ট্রের ধারনাটাই বুঝতে পারছোনা। আমরা হঠাৎ করে অতীতের শেকল ছুড়ে ফেলতে পারিনা। পুরোনো ব্যাবস্থার অবশেষ থেকেই আমাদের নতুন সমাজ বিনির্মান করতে হবে। এতে সময় লাগবে।’

 

ও বললো, ‘না, পুরোনো ব্যাবস্থা ছুড়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে জনগণকে স্বাধীন জীবন যাপন শুরু করতে হবে, নইলে সুযোগ হাতছাড়া হবে।’

ব্যাপারটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গেলো। আমি আর ধৈর্য রাখতে না পেরে বললাম, ‘তোমার নিরেট মাথায় কিছু ঢুকবে না।’

বাকুনিনের ওপরও ব্র্যান্ডির প্রভাব পড়ছিলো। ও বললো,‘মার্ক্স, তুমি একটা আস্ত হারামজাদা। বুঝতে তুমিই পারছোনা। তোমার মনে হয় শ্রমিকরা তোমার তত্ত্ব মেনে বিপ্লব করবে? ওরা তোমার তত্ত্বের থোরাই কেয়ার করে। ওদের ক্রোধ স্বত:স্ফূর্তভাবে বাড়বে, তোমার তথাকথিত বিজ্ঞান ছাড়াই ওরা বিপ্লব করবে। বিপ্লবের প্রবৃত্তি ওদের রক্তের মাঝে আছে।’এর পর চিৎকার করে বললো, ‘আমি তোমার তত্ত্বে থুতু দিই।’

বলতে বলতে ও মেঝেতে থুতু ছেটানো শুরু করলো। কেমন জানোয়ার! বাড়াবাড়ি দেখে আমি বললাম,‘মিখাইল, তুমি আমার তত্ত্বে থুতু মারতে পারো, ঘরের মেঝে কেন নোংরা করছো? পরিষ্কার করো, এক্ষুণি পরিষ্কার করো।’

ও বললো, ‘আমি জানতাম, তুমি একটা হতছাড়া গুণ্ডা।’

আমি বললাম, ‘আমিও জানি তুমি একটা কাপুরুষ।’

বাকুনিন একটা আদিম জন্তুর মতো গর্জন করে আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। বুঝতে পারছেন, লোকটার কী বিশাল ওজন। আমরা দুজন মেঝেতে কুস্তি শুরু করলাম। তবে দুজনে এতো মাতাল ছিলাম যে কেউ কাউকে জখম করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে হাঁফাতে লাগলাম, মেঝেতে শুয়েই। এরপর বিশাল জলহস্তির মতো বাকুনিন উঠে দাঁড়ালো, প্যান্টের বোতাম খুলে জানলা দিয়ে পেশাব করা শুরু করলো। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ‘মিখাইল, কী করছো তুমি।’

‘তোমার কী মনে হচ্ছে? আমি তোমার জানলা দিয়ে পেশাব করছি।’

আমি বললাম, ‘মিখাইল, তুমি বাড়াবাড়ি করছো।’

‘আমি লন্ডনের ওপর পেশাব করি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর পেশাব করি।’

আমি বললাম, ‘না, তুমি আমার ঘরের রাস্তায় পেশাব করছো।’

ও কোনো উত্তর দিলো না, প্যান্টের বোতাম লাগিয়ে মেঝেতে শুয়ে নাক ডাকাতে লাগলো। আমিও মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কয়েক ঘণ্টা পরে ভোর বেলা, জেনি ঘুম থেকে উঠে আমাদের ঐ অবস্থাতেই আবিষ্কার করলো।

(এক ঢোক বিয়ারের জন্য থামলেন)

না,ওরা কমিউনকে বাঁচতে দিলো না। কমিউন ছিলো বিপদজনক, বাকী দুনিয়ার জন্য মারাত্বক এক উদাহরণ, তাই একে রক্তে ডুবিয়ে মারা হলো। এখনো তাই হয়, হয় না?  এখনো পৃথিবীর কোনে কোনে, জনসাধারণ পুরোনো ব্যাবস্থাকে হঠিয়ে নতুন করে বাঁচার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। ওরা কোন ভাবাদর্শ বোঝেনা, এই হতশ্রী বেঁচে থাকায় ওদের ঘেন্না ধরে গেছে। যখনি এমন বিপদজনক কিছু ঘটে, ওরা তখন কাজে নেমে পড়ে। ওরা বলতে কাকে বোঝাচ্ছি বুঝতেই পারছেন। কখনো গোপনে, ধূর্ত্ততার সাথে, কখনো সরাসরি সহিংসভাবে তাকে ধ্বংস করা হয়।

(পত্রিকা থেকে পাঠ) তো, ওরা বলছে, ‘পুঁজিবাদ বিজয়ী হয়েছে।’বিজয়ী? কেন? শেয়ার বাজার আকাশ ছুঁয়েছে। শেয়ার মালিকরা আগের চেয়ে ধনী-এই কারণে? বিজয়ী? যখন খোদ আমেরিকার চার ভাগের এক ভাগ শিশু দারিদ্রের মাঝে বাস করে, যখন প্রতি বছর সেই শিশুদের চল্লিশ হাজার এক বছর বয়স হওয়ার আগেই মারা যায়?

(পত্রিকা থেকে পাঠ) নিউইয়র্ক শহরে দুই হাজার চাকরির জন্য ভোর হওয়ার আগে থেকে এক লক্ষ লোকের লাইন। বাকি আটানব্বই হাজারের কী হবে? এজন্য কি আরো বেশি জেলখানা বানানো হচ্ছে? ঠিক আছে, পুঁজিবাদই জিতেছে। কিন্তু হেরেছে কে?

আপনাদের হাতে এখন প্রযুক্তির জাদু, মানুষ চাঁদে গেছে, কিন্তু পৃথিবীতে রয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কী হবে? ওরা এতো হতাশ কেন? কেন ওরা মাদকাসক্ত হচ্ছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, খুন করছে? (পত্রিকা তুলে ধরবেন) এসব কথা পত্রিকাতেই লেখা।

আপনাদের রাজনীতিবিদরা তো অহঙ্কারে আটখানা। দুনিয়া এখন চলবে ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’তে।

এরা সব কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে নাকি? এরা কী মুক্তবাজার অর্থনীতির ইতিহাস জানে না? সেখানে সরকার জনগণের জন্য কিছুই  না করে সব কিছু করে ধনীদের জন্য? সেখানে সরকার হাজার মিলিয়ন একর জমি রেল কোম্পানিকে বিনা পয়সায় দিয়ে দেয়, আর যে সব শ্রমিক সেখানে দিনে বারো ঘন্টা শ্রম দিয়ে ঠাণ্ডায় নয়তো গরমে মরে তাদের দিকে ফিরেও তাকায়না। আর শ্রমিকরা যখন বিদ্রোহ করে ধর্মঘট করে তখন তাদের পরাস্ত করতে আর্মি নামায়।

যদি পুঁজিবাদের, মুক্ত বাজারের দূর্দশা নাই দেখতাম তা হলে আমি কোন দূঃখে ডাস ক্যাপিটেল লিখলাম? ইংল্যান্ডে ছোট শিশুদের টেক্সটাইল মিলে কাজে ঢোকানো হতো কারণ ওদের ছোট আঙুলে সুক্ষ কাজ ভালো হয়। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের মিলগুলোতে দশ বছরের মেয়েরা কাজে ঢুকতো, পচিশ বছরের মধ্যে মারা যেতো। শহরগুলো ছিল অপরাধ আর দারিদ্রের অভয়ারণ্য। এই হচ্ছে পুঁজিবাদ, তখনও যা ছিলো এখনও তাই আছে।

হ্যাঁ, আপনাদের পত্রিকায়, টিভির পর্দায় বিলাস দ্রব্যের বিজ্ঞাপন আমিও দেখেছি। (দীর্ঘশ্বাস) আপনারা এত বেশি দেখে এতো কম জানেন!

আচ্ছা, কেউ কি ইতিহাস পড়েনা? (ক্রোধ) আজকাল স্কুলে কী ঘোড়ার ডিম শেখানো হয়? (মঞ্চের আলো হুমকি দেয়ার মতো জ্বলে-নিভে উঠবে, মার্ক্স ওপরে তাকাবেন) এরা খুব স্পর্শকাতর।

জেনির কথাগুলো মনে পড়ছে। ও থাকলে নিশ্চই এসব নিয়ে কিছু বলতো। ও আমার চোখের সামনে মারা গেল, অসুস্থ, অসহায়। ওর তখন নিশ্চই আমাদের সুখের দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিলো-প্যারিসে, এমন কী এই সোহোতে।

আমার মেয়েদের কথাও খুব মনে পড়ছে...

(আবার একটা পত্রিকা তুলে পড়বেন) ‘পারস্য যুদ্ধের বর্ষপূর্তি, মধুর বিজয়।’এসব মধুর বিজয়ের কথা আমার জানা আছে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে হাজার হাজার মৃতদেহ, খাবার আর ওষুধের অভাবে লক্ষ লক্ষ শিশুর মৃত্যু। (পত্রিকা নাড়বেন) ইউরোপ, আফ্রিকা, ফিলিস্তিনে সীমান্তে একে অপরকে হত্যা করছে। (বেদনার্ত)

আপনারা কী শোনেননি দেড়শো বছর আগে আমি কী বলেছিলাম? এসব কিম্ভুত জাতীয় সীমানাগুলো মুছে ফেলো। আর কোন পাসপোর্ট না, কোন ভিসা না, কোন সীমান্ত রক্ষী না। আর কোন পতাকা না, জাতি নামের কৃত্রিম কোন অস্তিত্বের নামে আর কোন বশ্যতার আহ্বান আর না। দুনিয়ার মজদুর, এক হও। (কোমড় ধরে হেটে বেড়াবেন) ও খোদা, এই কোমড়ের ব্যাথা আমার জান হারাম করে দিলো...

কবুল করি, টিকে থাকার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। অসুস্থ এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে যে মাদক ব্যবহৃত হবে আমি তা কল্পনা করিনি। শিল্প চালু রাখতে যুদ্ধ, দুর্দশা ভুলিয়ে রাখতে দেশপ্রেমের জোয়ার, পরিত্রাতার আগমন ঘটবে বলে ধর্মান্ধদের প্রতিশ্রুতি . . .(মাথা নাড়বেন) যিশুকে আমি চিনি। তিনি আর ফিরে আসবেন না।

পুঁজিবাদের আয়ু শেষ -১৮৪৮ সালেই এমন ভাবা ভুল হয়েছিলো। সময়টা ঠিক ধরতে পারিনি। বোধ হয় শ’দুয়েক বছর এদিক-ওদিক হয়ে গেছে। (হাসবেন) তবে পাল্টাবে। বর্তমান সব ব্যাবস্থা পাল্টাবে। মানুষ তো আর বোকা নয়। প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন বলেছিলেন না-সব মানুষকে সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। মানুষের সাধারণ বোধ, ন্যায্যতার প্রতি তাদের বোধই তাদের এক করবে।

না, না, উপহাস করবেন না। আগেও এমন হয়েছে। আরো অনেক বড় আকারে আবার তা হতে পারে। আর তখন সমস্ত সম্পদ, সব বাহিনী নিয়েও এই সমাজের শাসকরা তা প্রতিহত করতে পারবে না। তাদের গোলামরা তখন গোলামী করতে অস্বীকার করবে, সৈনিকেরা আদেশ অমান্য করবে।

হ্যাঁ, প্রযুক্তিতে, বিজ্ঞানে পুঁজিবাদ অভূতপূর্ব অর্জন করেছে। তবে সে নিজেরই মৃত্যু ঘনিয়ে আনছে। মুনাফার জন্য তার সীমাহীন ক্ষুধা-আরো, আরো, আরো মুনাফা। এতে জগতটাই তাল হারিয়ে ফেলেছে। শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, সৌন্দর্যকে সে বেচা-কেনার পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। খোদ মানুষকেই পণ্য বানিয়ে ছেড়েছে। শুধু কারখানার শ্রমিক নয় - ডাক্তার, বিজ্ঞানী, উকিল, কবি, শিল্পী, নিজেকে বিক্রি করতে না পারলে এখানে কেউ টিকতে পারবে না।

এই সব মানুষ যখন বুঝতে পারবে তারা সবাই আসলে শ্রমিক, তাদের শত্রু এক তখন কী হবে? নিজেদের পূর্ণতার স্বার্থেই তারা সব এক হবে। আর তা শুধু নিজ দেশে হবে না কারণ পুঁজিবাদের দরকার বিশ্ববাজার। ‘মুক্ত বাণিজ্য’তাদের রণহুঙ্কার। কারণ আরো, আরো বেশি মুনাফার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র তার মুক্তভাবে দাবড়ে বেড়াতে হয়। কিন্তু তা ধরতে গিয়েই সে বোকার মতো বিশ্ব সংস্কৃতি সৃষ্টি করে। ইতিহাসে মানুষ কখনো এতো বিপুল হারে সীমান্ত অতিক্রম করেনি। সেই সাথে চিন্তাগুলোও সীমানা পার হচ্ছে। এসব থেকে নতুন কিছু জন্ম নেবেই। (থামবেন, চিন্তামগ্ন)

১৮৪৩ সালে আমি আর জেনি যখন প্যারিসে, আমার বয়স পঁচিশ, আমি তখন লিখেছিলাম যে, নতুন শিল্প ব্যাবস্থায় মানুষ তাদের কাজ হতে বিচ্ছিন্ন কারণ এই কাজ তাদের বিতৃষ্ণা জন্ম দেয়। যন্ত্র, ধোয়া, গন্ধ, কোলাহল তাদের ইন্দ্রিয়কে আক্রান্ত করে, ফলে প্রকৃতি থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একে বলা হয় উন্নয়ন। টিকে থাকার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অপর থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর যাপিত জীবন নিজের নয় বলে, যেভাবে বাঁচে সেভাবে বাচতে চায় না বলে তারা নিজ হতেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন স্বপ্ন, কল্পনা ছাড়া সুন্দর কোন জীবনের অস্তিত্ত্ব আর কোথাও থাকে না।

কিন্তু এমন হতেই হবে-এমন কোন কথা নেই। এখনো বেছে নেয়ার সুযোগ আছে। সম্ভাবনা, আমি মানি। কোন কিছুই নিশ্চিত না। এটা এখন পরিষ্কার। আমি খুব নিশ্চিত ছিলাম। এখন জানি যে কোন কিছুই হতে পারে। তবে মানুষকে উঠে দাঁড়াতেই হবে।

কথাটা খুব র‌্যাডিক্যাল মনে হলো না কি? মনে রাখবেন র‌্যাডিকেল হওয়ার সহজ অর্থ হচ্ছে সমস্যার গোড়াটা ধরতে পারা। আর সেই গোড়া হচ্ছি আমরা।

আমি একটা পরামর্শ দিতে পারি। মনে করুন আপনার পিঠে ফোড়া উঠেছে। মনে করুন বসে থাকলে আপনার অসহ্য যন্ত্রণা হয়, সুতরাং আপনাকে উঠে দাড়াতেই হবে। আপনাকে নড়ে-চড়ে উঠতেই হবে, কিছু একটা করতে হবে।

পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র নিয়ে আর না হয় কথা নাই বললাম। শুধু না হয় এই পৃথিবীর অতুলনীয় সম্পদ মানুষের কাজে লাগানোর কথা বলি। মানুষের যা প্রয়োজন তা দেয়া যাক, খাবার, ওষুধ, খোলা হাওয়া, পরিষ্কার জল, গাছ আর ঘাস, থাকবার জন্য সুন্দর ঘর, কিছু সময় কাজ, আরো বেশি অবসর। কেন জানতে চাইছেন কার জন্য? প্রতিটা মানুষের এই সব কিছু চাই।

যাক, এবার যাবার সময় হলো।

(সব কিছু গুছিয়ে তুলে রওনা হবেন, ঘুরে দাঁড়াবেন)

ফিরে এসেছি বলে আপনারা বিরক্ত হলেন না কি? ব্যাপারটা এভাবে দেখুন -

আর কোন পরিত্রাতা তো এলেন না, তাই মার্ক্সকেই আসতে হলো।