আর্কিমিডিস কি কখনো পৃথিবীটা নাড়াতে পেরেছিলেন?

দর্শন ও বিজ্ঞান: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০১৫, ০১:২০ পূর্বাহ্ন
arkmidis_pc

ইয়া. পেরেলমান

 

  “আমাকে দাঁড়ানোর মতো একটা জায়গা দিন, আমি পৃথিবীটাকে নাড়িয়ে দেব” – প্রাচীন বিজ্ঞানী যিনি লিভারের নিয়ম আবিষ্কারের জন্য খ্যাত, গ্রীক প্রতিভাবান ব্যক্তি আর্কিমিডিস নাকি একসময় উচ্চারণ করেন একথা। প্লুটার্ক বলেছেন “সিরাকুজের রাজা হিয়েরোর আত্মীয় ও বন্ধু আর্কিমিডিস একবার লিখেছিলেন যে, এই বল যেকোনো ভার নাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা যায়। এই যুক্তির জোরে অভিভূত হয়ে তিনি আরও বলেন, যদি আর একটা পৃথিবী থাকত, তিনি সেখানে যেতেন এবং সেখান থেকে আমাদের এই গ্রহকে উত্তোলন করতেন।”

  আর্কিমিডিস জানতেন যে, লিভারের সাহায্যে মানুষ নূন্যতম বল প্রয়োগ করে সব চেয়ে ভারী বস্তুও উত্তোলন করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন লিভারের বৃহত্তর বাহুতে বলটা প্রয়োগ করা এবং ক্ষুদ্রতর বাহুটাকে বোঝাটার ওপর কাজ করানো। সুতরাং তিনি ভেবেছিলেন অনেক বড় একটা লিভারের বৃহত্তর বাহুতে হাত দিয়ে চাপ দিয়ে তিনি পৃথিবীর ভরের সমতুল্য ভর তুলতে সক্ষম হবেন। স্পষ্টতার জন্য আমরা পৃথিবীকে ‘নাড়ানো’ বা তোলা বলতে বোঝাব পৃথিবীর তলের উপর এমন একটি ওজনকে তোলা যার ভর পৃথিবীর ভরের সমতুল্য।

  আমি বিশ্বাস করি, যদি এই প্রাচীনকালের বিশিষ্ট পন্ডিত জানতেন পৃথিবীর কি বিপুল ভর, তাহলে তিনি নিজেই নিজের কথা প্রত্যাহার করতেন। এবার ধরা যাক যে আর্কিমিডিসের নাগালের মধ্যে রয়েছে আর এক পৃথিবী এবং তাঁর অভিপ্রেত স্থানও তিনি খুঁজে পেয়েছেন। আরও মনে করা যাক, তিনি তাঁর মনমত দৈর্ঘ্যের লিভারও একটা তৈরি করেছেন। তা হলেও মাত্র ১ সেন্টিমিটার পৃথিবীর সমতুল্য ভর তুলতে তাঁর কত সময় লাগতো ভাবতে পারেন? – ত্রিশ লক্ষ কোটি বছর এবং তার কম নয়।

  জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভর জানেন। পৃথিবীতে এরকম ভরের কোন বস্তুর ওজন হবে প্রায় ৬,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টন। তাহলে কোনো মানুষ যে ৬০ কেজি ওজন সরাসরি তুলতে পারে, তার এই ওজন তুলতে যে লিভার লাগবে তার বৃহত্তর বাহুর দৈর্ঘ্য ক্ষুদ্রতর বাহু অপেক্ষা ১০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ গুন বড় হবে। এখর তোমরা গণনা করে সহজেই দেখতে পাবে যে ক্ষুদ্রতর বাহুর প্রান্তদেশ ১ সেমি তুলতে অপর বাহুর প্রান্তকে শূন্যে ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটারের এক বিশাল বৃত্তচাপ সৃষ্টি করতে হবে। অতএব এই অসম্ভব রকমের বড় দূরত্ব আর্কিমিডিসকে ঠেলতে হত পৃথিবীকে মাত্র ১ সেমি তুললে। সুতরাং কত কত সময় লাগতো তার। এমন কি এক অশ্বশক্তির সমান কাজ করতে অর্থ্যাৎ অনুমান করা যাক, আর্কিমিডিস ৬০ কেজি ওজন ১ সেকেন্ডে ১ মিটার তুলতে পারলেও পৃথিবীকে মাত্র ১ সেমি তুলতে তার ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ সেকেন্ড সময় লাগতো অর্থ্যাৎ ত্রিশ লক্ষ কোটি বছর। কিন্তু এই জীবদ্দশাতেও আর্কিমিডিস ও তাঁর কল্পিত লিভার পৃথিবীকে সূক্ষতম ‍চুল পরিমান অংশ তুলতে পারেনি।

  আর্কিমিডিসের শত পন্ডিত্য সত্ত্বেও কোনো রকম কলাকৌশলই এই সময়কে সংক্ষিপ্ত করতে পারে না। কারণ বলবিদ্যার মহামূল্য নিয়মানুসারে যান্ত্রিক সুবিধা সবসময়ই সরণের হ্রাসের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত অথবা অন্য কথায় সময়ের সঙ্গে জড়িত। এমনকি আর্কিমিডিস যদি সেকেন্ডে ৩০০,০০০ কিমি বেগেও কোনো লিভারকে ঠেলতে পারতেন – যা প্রকৃতির সবচেয়ে দ্রুততম বেগ বা আলোর বেগ, তাহলেও তিনি পৃথিবীকে মাত্র ১ সেমি তুলতে পারতেন ১ কোটি বছর ঠেলার ফলে।