অস্টিও-ওডোন্টো-কেরাটোপ্রোসথেসিস : চোখের ভিতরে দাঁত

দর্শন ও বিজ্ঞান: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর ২০১৫, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন
osteo-odonto-keratoprosthesis

"আচ্ছা ডাক্তার, দাঁত ফেললে কি চোখের ক্ষতি হয়?"
বাংলাদেশে ডেন্টিস্ট্রি প্র্যাকটিস করছে অথচ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি, এরকম ডাক্তার মনে হয় না একজনও পাওয়া যাবে। বাচ্চা থেকে শুরু করে বুড়ো মানুষ, অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন অথবা নিরক্ষর সমাজের এমন কোন স্তর নেই যেখানের মানুষেরা একই ধারণা নিয়ে বড় হয়নি। আমাদের সংস্কৃতিতে এরকম একটা উদ্ভট ধারণা কোথা থেকে এলো সেটা নিয়ে নৃ-বিজ্ঞানীরা আস্ত একটা গবেষণা করে ফেলাতে পারবে! কারণ যাই হোক না কেন, আমাদের সবার মধ্যে এরকম একটা ধারণা বেশ ভালোভাবেই জেঁকে বসা। 
 
১৭ কোটি মানুষের এই দেশে মানুষ ছাড়া আর সবকিছুই মানুষের জন্য এতো অপ্রতুল যে এই অজ্ঞতার জন্য সাধারণ মানুষকে ঠিক দোষও দেয়া যায় না। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় ইচ্ছা এবং আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও কোথায় গেলে সঠিক তথ্যটা পাওয়া যাবে সেটুকু জানার জন্যই মানুষকে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। স্বাস্থ্যখাতে এই নৈরাজ্যের অবস্থা আরো ভয়াবহ! 
 
এরকমই আরো অনেক তথ্যের মতই এটা আমাদের দেশের অনেক মানুষের, এমনকি ডেন্টিস্ট্রিতে থাকাও অনেকের জানা নেই যে চিকিৎসা শাস্ত্রে অনেক আগে থেকেই একটি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে যা আমাদের প্রচলিত এই ধারণার ঠিক বিপরীত! আমরা যেখানে জেনে বসে আছি যে দাঁত তুললে চোখের ক্ষতি হয়, সেখানে বাস্তবে বিজ্ঞানীরা এমন পদ্ধতি বের করেছেন যার মাধ্যমে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ চোখ রোগীর দাঁতের সাহায্য নিয়ে পুনর্গঠন করা হচ্ছে! 
 
পদ্ধতিটি যদিও আমাদের কাছে নতুন, সার্জনেরা এই পদ্ধতি ব্যাবহার করে আসছেন সেই ষাটের দশক থেকেই। এই পদ্ধতিটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন ইতালিয়ান চক্ষুসার্জন প্রফেসর বেনেদিত্তু স্ত্রামপেলি। তিনি নিজস্ব নকশা থেকে একটি চোখে প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম লেন্স তৈরী করান ইংল্যান্ডের কৃত্রিম লেন্স প্রস্তুতকারী কোম্পানি “রেয়নারস”দের দ্বারা এবং সেটি সফলভাবে একজন রোগীর চোখে প্রতিস্থাপন করেন। তিনি ছিলেন রোমের সেন্ট জন হাসপাতালের চক্ষু সার্জন। তিনি একই সাথে ইতালির প্রথম দিকের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকারী চিকিৎসকদের একজন। তিনি পরবর্তীতে হ্যারল্ড রিডলি এবং পিটার চয়েসের সাথে মিলে The International Intra-Ocular Implant Club প্রতিষ্ঠা করেন।
 
 
কখন করা হয়ঃ 
আমরা সবাই জানি চোখ মানুষের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যতগুলো ইন্দ্রিয় আছে তার মধ্যে ব্যবহারের দিক দিয়ে চোখ একা যত বেশী এবং যত ধরণের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে বাকি সবগুলা ইন্দ্রিয় মিলিতভাবেও সেটা পারে না। এই চোখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল কর্নিয়া। এটি চোখের সবচেয়ে বাইরের অংশ যেটি চোখকে বাইরের ধুলিবালি থেকে রক্ষা করে এবং চোখের আলো প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। কোন কারণে এই কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেলে সেটি এখন নতুন করে আরেকজন মানুষের কর্নিয়া দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায়। এক আমেরিকাতেই প্রতি বছর চল্লিশ হাজারের উপরে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সার্জারি করা হয়। তবে সব রোগীর ভাগ্য অতটা ভাল হয় না। কিছু কিছু দুর্ঘটনা আছে যেগুলোতে চাইলেও চোখের কর্নিয়াকে আর প্রতিস্থাপন করা যায় না। 
যেমন - চোখের কোন অংশ পুড়ে গেলে।  
কর্নিয়া অ্যাসিড বা অন্য কোন রাসায়নিক বস্তু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হলে ।
“স্টিভেনস-জনসন সিনড্রোম” বা লায়েল সিন্ড্রোম এর মত কিছু কিছু অসুখ হলে যেগুলো কর্নিয়া এমনভাবে নষ্ট করে দেয় যে চোখের নিজস্ব আরোগ্য ব্যাবস্থাও আর সেটাকে ঠিক করতে পারে না।
চোখের পানি তৈরী করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে যা কর্নিয়াকে সজীব এবং সতেজ রাখার একমাত্র উপায়।
এ ধরণের ক্ষেত্রে সজীব কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগীর দৃষ্টিশক্তি ফেরত আনার কোন উপায় থাকেনা। কিন্তু মানুষ তো থেমে থাকার পাত্র নয়। এই সমস্যা মোকাবেলা করার মতন একটি পদ্ধতি বিজ্ঞানীরা বহুদিন থেকেই খুঁজে ফিরছিলেন।
 
 
পদ্ধতিঃ
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ কর্নিয়ার প্রধান সমস্যা হল সেটা নতুন একটা কর্নিয়াকে সজীব রখার মত যথেষ্ঠ পরিমাণ চোখের পানি তৈরী করতে পারেনা। ফলে চোখের ওই অংশ শক্ত হয়ে অনেকটা ত্বকের মত খসখসে হয়ে যায়। এসব জায়গায় কৃত্রিমভাবে তৈরী লেন্সও খুব বেশী কাজ করেনা, কেননা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যেকোন ধরনের কৃত্রিম বস্তু শরীর নিতে চায় না। এই সমস্য সমাধানের জন্য স্ত্রামপেলি করলেন কি, চেষ্টা করলেন এমন একটা উপায় খুঁজে বের করার যার মাধ্যমে তিনি প্লাস্টিকের কর্নিয়া বসাতে পারবেন রোগীরই শরীরের অন্য কোন অংশের ভিতরে যা পরে আবার চোখে বসানো যাবে! এর জন্য মানুষের শরীরেরই একটা অংশ খুঁজতে শুরু করলেন যেটাকে হতে হবে শক্ত, স্ক্র্যাচ প্রতিরোধী এবং রোগীর নিজের ডি এন এ থেকে তৈরী! এবং একই সাথে সেটার বহুদিন পর্যন্ত প্লাস্টিক লেন্স ধারণ করার মত ক্ষমতা থাকতে হবে যা কিনা আবার চোখের মত স্পর্শকাতর জায়গায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে। এবং এই এতোগুলো কঠিন কঠিন শর্ত পূরণ করতে পারার মত শরীরের সবচেয়ে উপযোগী প্রার্থী একটিই পাওয়া গেল, সেটি হচ্ছে আমাদের দাঁত! 
 
তিনি করলেন কি, রোগীর একটি দাঁত আশেপাশের হাড়সহ তুলে নিয়ে এসে তাতে একটি ছিদ্র করে প্লাস্টিকের লেন্সটি বসিয়ে সেটিকে পুনরায় রোগীর মুখে প্রতিস্থাপন করলেন। হাড়সহ দাঁতটি সেখানে নতুন রক্তনালীসহ ভালভাবে বসে গেলে সেটিকে কিছুদিন পর তুলে রোগীর চোখে পুনরায় প্রতিস্থাপন করলেন যাতে সেটি রোগীর চোখে বিকল্প কর্নিয়া হসেবে কাজ করতে পারে। এবং তিনি সফল হলেন। বর্তমানে পদ্ধতিগতভাবে এতে অনেক উন্নতি আসলেও এখনো সার্জারির মূল ধারণাটি একই আছে।
 
 
কার্যপ্রণালীঃ
পুরো পদ্ধতিটি দুইটি বড় ধাপে সম্পন্ন কর হয়। 
 
 
প্রথম ধাপঃ 
১। প্রথমেই চোখের পাতার ভেতরের সমগ্র অংশের কর্নিয়ার ভগ্নাংশ, মরা চামড়া, এসব পরিষ্কার করে ফেলা হয়।
২। এবার মুখের থেকে মিউকোসার একটি অংশ তুলে এনে চোখের উপরে বসানো হয়।
৩। রোগীর একটি সুস্থ দাঁত (সাধারণত ছেদন canine/ প্রায় পেষন premolar দাঁত তোলা হয়) তার আশেপাশের হাড় এবং পেশী-বন্ধনী ligament সহ তুলে আনা হয়। 
৪। এবার হাড়-দাঁতের মিশ্রিত অংশ থেকে পাতলা একটি অংশ বোল্টের মাপে কেটে তাতে একটি ছিদ্র করা হয় যার মাঝে কৃত্রিম লেন্সটি বসানো হয়। 
৫। এবার এই লেন্সটিকে তার সজীব হাড়-দাঁতের মিশ্রন tooth-bone-cylinder complex সমেত পুনরায় গালে প্রতিস্থাপন করা হয় যেন সেটিতে রক্তজলিকা তৈরী হতে পারে।
 
 
দ্বিতীয় ধাপঃ (এটি প্রথম ধাপের নূন্যতম চারমাস পরে করা হয়)
১। রোগীর চোখে গালের যে মিউকোসা বসানো হয়েছিল সেটি তুলে ফেলা হয় এবং চোখের ভেতরের মৃত অংশটাও সরিয়ে ফেলা হয়। 
২। হাড়-দাঁতের মিশ্রণ tooth-bone-cylinder complex গাল থেকে অপসারণ করে রোগীর চোখে বসানো হয় এবং সেটি গালের মিউকাস দ্বারা পুনরায় ঢেকে দেয়া হয়। 
প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে আলো আগের মতই অপটিক নার্ভে কৃত্রিম লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে পারে এবং রোগী আগের মতই দেখতে পায়।
 
 
অসুবিধাসমূহঃ 
১। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল এবং খরচসাপেক্ষ। এটি করার জন্য বিশেষ দক্ষতা এবং জ্ঞানের প্রয়োজন হয় বলে পৃথিবীর মাত্র অল্প কয়েকটি জায়গায় এই ধরনের সার্জারি করা হয়ে থাকে। 
২। একই কারণে এই অপারেশন শুধু একটি চোখে করা হয় কারণ যেকোনো সময় জটিলতা তৈরী হবার ফলে অপারেশনটি অসফল হতে পারে। তবে একবার পুরো প্রক্রিয়াটি সফলভবে সম্পন্ন করা গেলে সেটি বহুদিন পর্যন্ত ঠিক থাকে। 
৩। এই অপারেশনের ফলে রোগী তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেও তার বাহ্যিক সৌন্দর্য ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চোখের স্বাভাবিক চেহারা পুরোই পরিবর্তন হয়ে যায়। অনেকে এই সার্জারি করা চোখকে "সাইবর্গ চোখ" বলে থাকে!
 
এতোকিছুর পরেও যেই মানুষ চোখেই দেখতে পেতোনা, তাকে শরতের নীল আকাশ অথবা সন্তানের ফোকলা দাঁতের হাসি দেখতে পারার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবার মত আনন্দের আর কি হতে পারে? মানুষের ভারে ন্যুজ্ব এই দেশের শতকরা ১৫ শতাংশ মানুষ কোন না কোন রকম দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতায় ভুগছে। সেই দিন হয়তো দূরে নয় যেদিন আমারা দেশেই এদেশের সাধারণ মানুষকে এরকম সেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। হয়তো এখনই আমাদেরই কিছু তরুণ মেধাবী ডাক্তারেরা সাধারণ মানুষের মাঝে কম মূল্যে এই ধরনের বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দেবার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করে চলেছে। 
 
 
 .................................................................................
ডা. সালিমা নাহার, ডেন্টাল সার্জন