দেশত্যাগীদের কথা

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:০৬ পূর্বাহ্ন
deshtiyagi

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশীর প্রহসন যুদ্ধ পরবর্তী বাংলা ও বাঙালির জীবনে সবচেয়ে তীব্র মানবিক ট্রাজেডি ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টের মর্মান্তিক দেশভাগ। উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ এবং উৎপাটনের সেই ভয়ানক স্মৃতি আজও ভুক্তভোগীদের জীবন থেকে তারা মুছে ফেলতে পারে নি। এবং ঘটনাটি মুছে ফেলার ন্যায় মোটেও ছিল না। সামগ্রিকভাবে দেশভাগই বাংলা এবং বাঙালিদের খন্ডিত করে দিয়েছিল। যার পরিসমাপ্তি আর ঘটেনি। ঘটবে বলেও অনুমান করা যাবে না। সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ ডাল-পালা মেলে বিস্তৃত হয়েছিল ঐ দেশভাগকে অনিবার্য করার কৌশলী রাজনীতির চালে। যার ক্ষত থেকে জাতির আজও পরিত্রাণ ঘটে নি। সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে রাজনীতির সেই সাফল্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলের-মতের অভাব নেই আজও; যেমন ভারতে-তেমনি বাংলাদেশেও। ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় এখন হিন্দু মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি। অপরদিকে বাংলাদেশে জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকারের আশীর্বাদে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাংবিধানিক বন্ধ দুয়ার উন্মোচনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়-বাড়ন্ত ক্রমেই অসীম পর্যায়ে। এই হীন রাজনীতি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে পেছন দিকে নেবার গভীর চক্রান্তে মগ্ন। পচনশীল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পরিণতির অভিমুখে বাংলাদেশকে ঠেলে দেবারও অপচেষ্টায় লিপ্ত। এর থেকে পরিত্রাণের প্রধান উপায়টি হচ্ছে সাংবিধানিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। সাংবিধানিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দুয়ার উন্মুক্ত রেখে দেশকে সা¤প্রদায়িকতা এবং জঙ্গি মুক্ত করা যাবে না। রাষ্ট্র যতই পাহারা দিক তাতে শুভফলের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।


সাতচল্লিশে, পঞ্চাশে, পঁয়ষট্টিতে এবং একাত্তরে দেশত্যাগী মানুষের কষ্ট-বেদনা বাংলার ইতিহাসে মানবেতর ট্রাজেডী রূপে ঠাঁই পেয়েছে। স্থায়ীভাবে দেশত্যাগী মানুষের পাশাপাশি সাময়িকভাবে অনেকে জীবিকার তাড়নায় দেশত্যাগ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রম বেচতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কম নয়। তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। রাষ্ট্র বা সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ব্যতিরেকে তারা স্বউদ্যোগে শেষ সহায়-সম্বলের বিনিময়ে জীবিকার তাগিদে বিদেশে যায়, অর্থ উপার্জন করে এবং অর্জিত সমস্ত অর্থ দেশে পাঠায়। তাদের দেশপ্রেম অসামান্য নয়। অনন্যই বলা যাবে অনয়াসে। অপর দিকে দেশের বিত্তবান শ্রেণি অর্থাৎ শাসক শ্রেণির অন্তর্গত রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী হতে জনসংখ্যার ক্ষুদ্র এই অংশটি দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে। সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়তে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে। এদেশ থেকে নানা উপায়ে অর্থ হাতিয়ে বিদেশে গড়ে তোলে স্থায়ী আবাস। যার নানা আলামত আমরা হর-হামেশা দেখে থাকি। এমন কি সম্প্রতি আমাদের ক্রিকেটের সম্রাট সাকিব-আল হাসান পর্যন্ত নিজ সন্তানের জন্ম দিতে স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে জিম্বাবুয়ে দলের সঙ্গে চলমান সিরিজের একটি খেলায় অংশ নিয়ে সিরিজ ফেলে ছুটে গেছেন সন্তানের জন্ম উৎসবে। উদ্দেশ্য সন্তানের জন্মসূত্রে বিদেশের নাগরিকত্ব লাভ। ক্রিকেট খেলোয়াড় এবং অর্থ এখন একে-অন্যের পরিপূরক এবং অবিচ্ছেদ্যও বটে। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের অর্থ আয়ের পরিমাণ জানলে চমকে উঠতে হয়। পণ্যের বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েও ক্রিকেট তারকাদের উপার্জনের খতিয়ান শুনলে আঁতকে উঠবেন প্রত্যেকে। বিপুল অর্থের মালিকদের অর্থের জোয়ারে দেশপ্রেম বলে আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না। তারা কেবল দেশ থেকে অর্থ হাতিয়ে বিদেশে পাচার করে সেখানে পরিবার নিয়ে নিশ্চিত-নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন বুনন করে। এই দেশত্যাগীদের দেশপ্রেমিক মোটেও বলা যাবে না। অনিবার্যভাবে তারা দেশবিরোধী অপকীর্তিতে মত্ত। যাঁরা প্রাণ বাঁচাতে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে ভিটেমাটি ছেড়েছিল এবং যাঁরা জীবিকার অন্বেষণে সাময়িক দেশত্যাগী হতে বাধ্য হয়েছে; তারা প্রত্যেকে দেশপ্রেমী নিরপরাধ মানুষ। তাদের সঙ্গে দেশবিরোধী ক্ষুদ্র অংশের বিন্দুমাত্র তুলনা চলে না। বিত্তবান শাসক শ্রেণির ঐ অংশটি নিশ্চিতরূপে দেশ বিরোধী। তাদের তালিকায় আমাদের নানা ক্ষেত্রের বিশিষ্ট তারকাদেরও অনায়াসে যুক্ত হতে দেখা যায়।


১৯৪৭-এর রক্তাক্ত দেশভাগের বোঝা সুদীর্ঘ ৬৮বছর টেনেছে ছিটমহলবাসী মানুষ। নিজ মাতৃভূমিতে পরবাসী জীবনের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতায় ক্লান্ত ছিটমহলের অধিবাসীদের ১৮৩ জন দেশত্যাগী নারী-পুরুষ গত ১৯ ও ২২শে নভেম্বর ভারতে চলে গেছে। গত ৩১শে জুলাই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। উভয় দেশের যৌথ জরিপের ভিত্তিতে জরিপ সম্পন্ন হয়। চুক্তির মাধ্যমে বিলুপ্ত ছিটমহলসমূহের নাগরিকেরা তাদের পছন্দমতো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভের অধিকার অর্জন করে। ৫৯টি ছিটমহলের নাগরিকত্বের আবেদন করা স্বেচ্ছায় দেশত্যাগী নাগরিকদের মধ্যে সাতটি ছিটমহলের ১৯৭ জন নারী-পুরুষ ইতোমধ্যে ভারতে নাগরিকত্বের অনুমোদন লাভ করেছে। ভারত সরকার চুক্তি অনুযায়ী দেশত্যাগীদের জন্য ট্রাভেল পাস ইস্যু করে। ইস্যুকৃত পাসের মাধ্যমে হাতীবান্ধার ১৩৫ ও ১৩৬ গোতামারী ছিটমহল দুটি থেকে এবং পাটগ্রামের লতামারী ছিটমহলের ১৮ পরিবারের ৬৩ জন গত ১৯শে নভেম্বর প্রথম দেশত্যাগী রূপে চ্যাংড়াবান্ধা স্থল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গমন করে।


দ্বিতীয় দফায় ২২শে নভেম্বর পঞ্চগড় সদর উপজেলার গারাতি, বোদার, নাটকটোকা, বেহুলাভাঙা, কাজলদীঘি ও নাজিরগঞ্জের বিলুপ্ত ছিটমহলের ১৪টি পরিবারের ৪৮ জন। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি-হলদিবাড়ী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গেছে। দ্বিতীয় দফার অপর দলটি ঐ একই দিন ২২শে নভেম্বর কুড়িগ্রামের ৭২ জন নারী-পুরুষও দেশত্যাগ করেছে। দুই দফায় ভারতে চলে যাওয়া দেশত্যাগী মানুষের আহাজারি-চোখের পানিতে ভিটেমাটি ভিজিয়ে প্রতিবেশীদের থেকে স্থায়ী বিদায় বেলায় শোকের মাত্ম লক্ষ্য করা গেছে। রেখে গেছে তাঁরা ৬৮বছরের দুঃসহ স্মৃতিময় নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা আর চিরচেনা পরিবেশ-প্রতিবেশী। স্বজন বিদায়ের ন্যায় প্রতিবেশীরাও কেঁদে কেটে বিদায় জানিয়েছে দেশত্যাগীদের। একই ভূমিতে পৃথক রাষ্ট্রের অধীনে ৬৮বছরের চরম নিষ্ঠুরতায় তারা বাধ্য হয়েছে দেশত্যাগে। দুই রাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রেরই নাগরিকের মর্যাদা-অধিকার তারা সুদীর্ঘ ৬৮ বছরে পায় নি। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের সীমানা জুড়ে ভারত কর্তৃক কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ জাতীয়ভাবে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন নিশ্চয় করেছে। কিন্তু সীমার দু’পারের মানুষের বন্ধন ছিন্নেও কি পোক্ত আসন নেয় নি?


দেশত্যাগী ৮৩ বছরের বৃদ্ধ তারক বর্মণ নিজ ভাগ্নেকে এদেশে রেখে চলে যাবার সময় কান্নায় ভাগ্নের উদ্দেশ্যে নিজের কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করেছে, “বাবা আর বুঝি মুই বাছিম না। তোমার গুলাক থুইয়া ইন্ডিয়াতে কেমুন করি থাকিম। মুই কি থাকির পাইম।”  তারক বর্মণের পাশের বাড়ির ৬৯ বছরের বিনোদ বর্মণ ও তার স্ত্রী কিরণ বালা বর্মণ প্রতিবেশীদের জড়িয়ে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্থানীয় প্রতিবেশী জনৈক জামাল হোসেন দেশত্যাগীদের প্রসঙ্গে কেঁদে কেঁদে বলে, “হামার মনোত বড় কষ্ট লাগছে বাহে। এতকাল মিলেমিশে ছিনু হামরা। ওমরা গেইলে এলা গ্রামটা ফাঁকা ফাঁকা লাগবে। ওদের ছাড়া হামরা থাকিম ক্যামনে।” অপর দেশত্যাগী দ্বিজেন বর্মণ চোখের পানি ফেলে কেঁদে কেঁদে বলেন, “কষ্টের পারাপার করছি। একদিকে বাপ-দাদার ভিটামাটি আর নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করছি। ভারতে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব পেতে যাচ্ছি। সব মিলিয়ে চোখের জলে বুক ভাসানো অবস্থা আমাদের।” একই কষ্টের কথা সবার মুখে মুখে। ২২শে নভেম্বর কুড়িগ্রাম থেকে ভারতে যাওয়া দ্বিতীয় দলটির দেশত্যাগী বৃদ্ধা আকলিমা বেগম। কিন্তু দেশে রেখে যাচ্ছেন নিজ কন্যা খদিজাকে। মাকে বিদায় দিতে আসা খদিজার বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত কেউ চোখের পানি আটকে রাখতে পারে নি। মায়ের উদ্দেশ্যে খদিজার আর্তনাদ, “মোর কী হইব মা। মোর কিছু হইলে এালা কায় মোর খবর লিবে। অসুখ হইলে দেখবার পাবার নাই।” দাসিয়াছড়ার বিলুপ্ত ছিটমহলের খদিজা ছাড়া পুরো পরিবার ভারতে চলে গেছে। একমাত্র মেয়ে খদিজাকে ফেলে বৃদ্ধা আকলিমার কান্না আর্তনাদে বুঝতে অসুবিধা নেই বৃদ্ধা আকলিমা এই দেশত্যাগ মেনে নিতে পারছিল না। দাসিয়াছড়ার গৃহবধূ শাহনাজ স্বামীর সঙ্গে ভারতে চলে গেল। পুরো পরিবার রয়ে গেল দেশে। শাহনাজের স্বামী হামিদুলকে বিদায় জানাতে আসা বন্ধু মজনু গলা জড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছে, “একসঙ্গে পড়াশোনা-খেলাধুলা করে পরস্পর বেড়ে উঠেছি। অথচ এই মুহূর্ত হতে আমরা স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি। বিচ্ছিন্ন হবার এই বিদায়ের কষ্ট একমাত্র আমাদের ন্যায় ভুক্তভোগী ব্যতীত কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না।”


এটাই প্রকৃত সত্য ভুক্তভোগী ছাড়া দেশত্যাগে বাধ্য ছিটমহলবাসীর কষ্ট কেউ বুঝতে পারবে না। দীর্ঘ ৬৮ বছর নিজ ভূমে পরবাসী মানুষদের কষ্ট, যন্ত্রণা, মানবেতর জীবন-যাপনের সংবাদ সাতচল্লিশে বিভক্ত দুই রাষ্ট্রের কেউ কানে নেয় নি। ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাগরিকহীন জীবনে কোনো রাষ্ট্রই কার্যত ভূমিকা রাখে নি। দুই রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতায় তাদের অতিক্রান্ত হয়েছে জীবনের সিংহভাগ সময়। জীবন সায়াহ্নে এসে তাদের এই দেশত্যাগ সুখের কি-ই-বা বার্তা আনবে! কেবল পরিবারের এবং সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তারা দেশত্যাগ করেছে। এছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। ৬৮ বছর অতিক্রান্তে তাদের দুর্দশা মিটবে সত্য কিন্তু দেশ, মাতৃভূমি, চিরচেনা পরিবেশ-প্রতিবেশী, স্বজনদের তারা ভুলবে কোন উপায়ে? দেশত্যাগী মানুষের কষ্ট, বেদনা বয়ে বেড়ানোর দুঃসহ স্মৃতি শুরু সেই সাতচল্লিশে, কিন্তু শেষ কবে?


.................................................................................
মযহারুল ইসলাম বাবলা
লেখক, প্রাবন্ধিক
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত।