সে যে আমার জন্মভূমি: জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের গান

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ১০:৫৯ অপরাহ্ন
colum_rafin2

ধন ধান্য পুষ্প ভরা গানটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছিলেন ১৯১০ সালে, এটা তাঁর শাজাহান নাটকের একটি অংশ আসলে। এটা সেই সময়, উপনিবেশবাদের দাস প্রভুর ভাষা শিখে নিয়েছে, নিয়ে সেই ভাষা ব্যবহার করছে সেই প্রভুরই বিরুদ্ধে। সেই ভাষা জাতীয়তাবাদের।

১৯০৫ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকরা তাদের কুখ্যাত ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি অনুসারে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটাতে বঙ্গভঙ্গ করেছিলো, এটা কাকতালীয় নয়, সে বছরই হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগ গঠিত হয়। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন পরে হিন্দু পুনর্জাগরবাদী প্রতিক্রিয়ার দখলে যায়, যা বিপরীতে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়, কিন্তু সূচনালগ্নে এই আন্দোলনের একটা অসাধারণ অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ছিলো (উমর, ১৯৮৭ঃ ১২-১৩ , চৌধুরী ২০১৫ঃ ১৩-৩৫)। ধন ধান্য পুষ্প ভরা যার অকাট্য প্রমাণ।

এই গান বঙ্কিমের বন্দে মাতরমের মতো মা দূর্গার মধ্যে কল্পনা করে নি দেশকে। কারণ মুসলমানের কাছে মা দূর্গা গ্রহণযোগ্য নয়। এই গান রূপসী বাংলাকে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি করেছে, যা চরিত্রগতভাবে অসাম্প্রদায়িক, সেই কারণেই ধর্মনিরপেক্ষ। বাঙালি জাতির, বা দেশের, এই পরিচ্ছন্ন ধারণা পরবর্তীতে পাওয়া যাবে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কিংবা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে। দুর্ভাগ্যবশত উপমহাদেশের "জাতীয়তাবাদী রাজনীতি" হিন্দুধর্ম বা ইসলামের প্রভাব থেকে বেরোতে পারে নি, অনুসরণ করে নি, উল্লিখিত উদাহরণ। তাই বিজেপিকে গুজরাত গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করার সময় কংগ্রেস ভুলে যায় তাদের হাতেও শিখদের রক্ত লেগে আছে। বিএনপির বিরুদ্ধে জামাতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার অভিযোগ তোলার সময় আওয়ামি লিগ ভুলে যায় তার খেলাফত মজলিশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা আর রাষ্ট্রধর্ম অদ্ভূতভাবে সহাবস্থান করে।

এই গান এমন একটা দেশের কথা বলে, যা স্বপ্ন দিয়ে তৈরি আর স্মৃতি দিয়ে ঘেরা, সেই দেশ। আকুল আবেগের কারণে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোও অলৌকিক হয়ে ওঠে, চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারার ধারা যেনো সেই দেশে একটু বেশিই উজ্জ্বল, আর কোথাও কালো মেঘে খেলে না এমন তড়িৎ। এতো স্নিগ্ধ নদী আর এতো ধোঁয়াশা পাহাড়, এতো সবুজ খেত আর কোথাও আকাশতলে মেশে না এমনভাবে, এভাবে ধানের ওপর বাতাসের ঢেউ খেলে যায় না আর কারো দেশে। শাখায় শাখায় ফুল, কুঞ্জে কুঞ্জে পাখি, এখানে ফুলের মধু খেতে ধেয়ে আসা ভ্রমর সুখে ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের বুকে। ভাইয়ের মায়ের এতো আদর আর কোথাও পাওয়া যাবে না, তাই মায়ের চরণদুটি বুকে জড়িয়ে ধরিয়ে কান্নাভরা কণ্ঠস্বরে বলতে ইচ্ছে হয়, এই দেশেতে জন্ম যেনো এই দেশেতেই মরি। এই দেশ কাল্পনিক। অথচ এই কাল্পনিক দেশ রক্তের চেয়েও প্রিয়।

"এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি", গানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ সম্ভবত এইটাই, এটা জাতীয়তাবাদের সূচনালগ্নের তীব্র আবেগতাড়িত একটি গান। তখনো আদিবাসীদের সাথে বাঙালিদের দূরত্ব তৈরি হয় নি, গারো আর সান্তালরাও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দারুণ লড়াই সংগ্রাম করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে মারমা যুবকরা বাঙালিদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়েই পাক সামরিক-আমলাতান্ত্রিক ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার ১৯৭১এর আগে হয় নি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে, এইচ. টি. ইমামের উসকানিতে একদল বিপথগামী মুক্তিযোদ্ধা চাকমাদের জবাই করা ও চাকমা মেয়েদের ধর্ষণ করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কলঙ্ক আরোপ করেছিলো (রহমান, ২০১৫:২২)। তারপর বায়াত্তরের সংবিধানের স্বয়ম্বর সভায় যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করা হয়েছিলো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে, নির্বোধ স্পিকার আদিবাসীদের জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবীর বিরুদ্ধে বলেছিলেন, "আপনি কি বাঙালি হতে চান না (আহমেদ, ২০১৫:৯২)?" তারও পরে শেখ মুজিবের আদিবাসী নেতাদের দাবীদাওয়াসম্বলিত ফাইল মাটিতে ছুঁড়ে মারা ও "আমি তোমাদের উপজাতি থেকে জাতিতে প্রমোশন দিলাম" বক্তব্য দেয়া (রহমান, ২০১৫: ২২-২৩) আর জিয়াউর রহমানের সময় থেকে সিএইচটিতে সেটেলার সংকট তৈরি করা ইতিহাসের অংশ। ২৫ই মার্চ ১৯৮০ থেকে ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৩ পর্যন্ত সিএইচটিতে ১৩টি গণহত্যা হয় সেনাবাহিনী আর সেটেলারদের যৌথ উদ্যোগে (রহমান, ২০১৫:১৫৪-৬৩)। উর্দুভাষীরা ভারতে সংখ্যালঘু ছিলো ধর্মের কারণে, পাকিস্তানে ভাষার, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে তাদের একাংশ রাগীব আহসানদের দ্বারা মগজধোলাইকৃত হয়ে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান করায় অন্যরা আজ পর্যন্ত সেই দায় মেটাচ্ছেন। রাগীবদের কিন্তু কিছু হয় নি, যুদ্ধের শেষ দিকে বিপদ বুঝে পালিয়ে গেছেন, পেছনে রিফিউজি করে রেখে গেছেন তাদেরকে যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই (চৌধুরী, ২০১৫:২৬৮)। এদেরকে নিয়েই হরিপদ দত্ত লিখেছেন মোহাজের উপন্যাস। আজকে আওয়ামি লিগের নেতার জমিলালসা মেটাতে এদেরকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় এবং এদের অনেকেই থাকে মানবেতর পরিস্থিতিতে। বিহার থেকে আসা সব উর্দুভাষী পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন এটা একটা পপুলার আওয়ামি প্রোপাগাণ্ডা। বাংলাদেশের পতাকার ডিজাইনারদের একজন ছিলেন সাইফুল্লাহ আজমী, উনি একজন উর্দুভাষী, পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির হয়ে অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধকালীন সময়ে আলোচনার নামে ডেকে নিয়ে গিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে উনাকে হত্যা করেছিলো মুজিববাহিনী (আলম, ২০১৪:৪০)। মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামি ইতিহাস উনার নাম মুছে ফেলেছে। উর্দুভাষী আর আদিবাসীদের প্রতি ঘৃণা দেশপ্রেম নয়, এমনকি জাতীয়তাবাদও নয়, এটা হচ্ছে ফ্যাশিবাদ। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও গণশত্রু ব্যক্তিবর্গ ব্যতিরেকে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জাতিসত্তা ও ভাষার অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা প্রদান করা আমাদের দায়িত্ব। যেই দায়িত্ব আজো আমরা পালন করি নি।

এই সবই সত্য, কিন্তু এটা কোনো কারণ হতে পারে না, ধন ধান্য পুষ্প ভরার অই চরণগুলোতে প্রকাশিত দেশপ্রেমকে আজকের বাংলাদেশে উর্দুভাষী আর আদিবাসীদের নিপীড়ণের জন্য দায়ী করার। কনটেক্সটের বাইরে গিয়ে টেক্সট বুঝতে যাওয়া বিপজ্জনক। এতে মানুষ মারাত্মকভাবে সরলীকৃত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

১৮৫৩-১৮৫৯ এই সময়কালটায় কার্ল মার্কস আর ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন পত্রিকায় একের পর এক প্রবন্ধ লিখে চলেছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে ভারতের সিপাহী যুদ্ধের সমর্থনে। তাঁরা এটাকে বলেছিলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। মার্কস প্রত্যাশা করেছিলেন ইংল্যান্ডে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা ইন্ডিয়ায় জাতীয় বিপ্লব দ্যাখা দেয়ার মাধ্যমে স্বাধীন হবে ভারতের জনগণ (হাবিব, ১৯৯৯:১-৫৫)।

সিপাহী যুদ্ধকে নৃশংসভাবে দমন করা হয়েছিলো, মেট্রোপল আর কলোনি কোথাওই প্রলেতারিয়ান বিপ্লব হয় নি, "স্বাধীন" ভারতের "জাতীয়তাবাদী রাজনীতি" সাম্প্রদায়িকতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এবং সেই রাজনীতির সাথে সাম্যবাদী রাজনীতি পেরে ওঠে নি।

কিন্তু জাতীয় মুক্তির লড়াই ঠিকই চলছে সেভেন সিস্টার্সে, কাশ্মীরে আর লাল পতাকার দণ্ডকারণ্যে; লড়াই চলছে বালুচিস্তানে; আমাদের এখানেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা দীর্ঘহীন সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন তাঁদের জাতীয় মুক্তির জন্য যা গণতান্ত্রিকভাবে আজো অব্যাহত। কারণ প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও নয়াউপনিবেশবাদ উপমহাদেশের কোটি মানুষকে নিজভূমে পরবাসী করে রেখেছে। বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানের হাত থেকে আমরা স্রেফ ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সত্যিকার স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায়, আমাদের "জাতীয়তাবাদী রাজনীতির" মেরুদণ্ডহীন ও লুম্পেন শাসকগোষ্ঠীর কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আজো তা পায় নি।

জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয় নি, ধন ধান্য পুষ্প ভরা সেই দেশের কল্পনা যদি আমরা বাস্তবায়িত করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আজকে এই লুম্পেন শাসকগোষ্ঠী আর তাদের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মুরুব্বিদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

রেফারেন্স:

১. আহমেদ, ফিরোজ (২০১৫) বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রের গতিমুখঃ সূচনাকাল, সর্বজনকথা, ১ম বর্ষঃ ৩য় সংখ্যা।

২. আলম, পারভেজ (২০১৪) শাহবাগের রাষ্ট্রপ্রকল্প। ঢাকাঃশুদ্ধস্বর।

৩. উমর, বদরুদ্দীন (১৯৮৭) বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। কলকাতাঃচিরায়ত।

৪. চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম (২০১৫) জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি। ঢাকাঃসংহতি।

৫. রহমান, বিপ্লব (২০১৫) পাহাড়ে বিপন্ন জনপদঃ সাংবাদিকের জবানবন্দিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অকথিত অধ্যায়। ঢাকাঃসংহতি।

৬. হাবিব, ইরফান (১৯৯৯) [অনুবাদ. কাবেরী বসু] ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গে, 'মার্কসীয় দৃষ্টিকোণে ইতিহাস লিখনের সমস্যাবলী'। কলকাতা:এনবিএ।

 

লেখক: ইরফানুর রহমান রাফিন