সন্ত্রাসবিরোধী সৌদি জোটের ফাঁদে বাংলাদেশ

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ০৬:১৮ অপরাহ্ন
military-alliance-with-saudi

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ে শিয়া-সুন্নি বিভেদ সৃষ্টির অভিলাষে সৌদি আরবকে দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী জোটের বাতাবরণে নতুন কৌশলী ফাঁদ পেতেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইতিমধ্যে এই জোটের পক্ষে নিজেদের অবস্থানও জানান দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নানারকম বিভেদ-বিভাজনে পারঙ্গম। অতীতের কৌশল পাল্টে নতুন কৌশল রূপে শিয়া-সুন্নি বিরোধ সৃষ্টিতে ফায়দা হাতানোর ঘৃণিত কৌশল গ্রহণ করেছে। এবং সেটা বাস্তবায়নে সৌদি রাজতন্ত্রকে লেলিয়ে দিয়েছে সুন্নি প্রধান দেশ সমূহের এই জোট সৃষ্টিতে। সুদীর্ঘকাল মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ব-সামরিক আগ্রাসন রাশিয়ার আইএস বিরোধী সামরিক অভিযানে ভেস্তে যেতে বসেছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই নয় ইসরাইলের আগ্রাসী ভূমিকার ক্ষেত্রেও রাশিয়া অপ্রত্যক্ষে পানি ঢেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নাকাল অবস্থার জন্য রাশিয়ার মিত্র শিয়া প্রধান দেশসমূহকে সমূচিত জবাব দেবার অভিলাষে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলি ষড়যন্ত্রে মাঠে নেমেছে সৌদি আরব। সুন্নি সংখ্যাধিক্য রাষ্ট্রসমূহকে শিয়া-সুন্নি বিভাজনের চক্রান্তে সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠনের এই হীন উদ্যোগ। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই জোটের বাইরে রাখা হয়েছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান, ইরাক, ইয়েমেন এমন কি শিয়া শাসকের অধীন সিরিয়াকে পর্যন্ত। ৩৪টি সুন্নি প্রধান দেশের এই জোটে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দিলেও ইতিমধ্যে এই জোটে অনেক দেশ নিজেদের অন্তর্ভুক্তির তথ্য অস্বীকার করেছে। আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া পর্যন্ত সৌদি নেতৃত্বে এই জোটে শামিল না হবার বিষয় নিশ্চিত করেছে। তাই এই জোটের ভবিষ্যত শঙ্কার মুখে।

    মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এযাবৎ নিজেদের সংক্ষুব্ধ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান কখনো নিতে পারে নি। কাজেই এই জোট নিয়ে আশাবাদী হবার কারণ নেই। সত্তর বছরের আরব লীগ, ওআইসি এবং মধ্যপ্রাচ্য সহযোগিতা কাউন্সিল-এর ন্যায় সক্রিয় সংগঠন নামে থাকলেও, কাজে কিন্তু নেই। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিহতে তাদের সাফল্য শূন্য। যুক্তরাষ্ট্রের চরম তাঁবেদার সৌদি আরব মার্কিনি নেতৃত্বাধীন ৬৫টি তাঁবেদার দেশের বাইরে এই জোটকে সম্প্রসারিত করবে না। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধানতম বিষফোঁড় আইএস বিরোধী অবস্থানও সৌদি আরব জোট গঠনে নিশ্চিত করেনি। পক্ষান্তরে আইএস বিরোধী লড়াইয়ের তিনপক্ষ সিরিয়া, লেবানন এবং ইরানকে জোটের বাইরে রেখে এই জোট মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা পালন করার অভিপ্রায়ে গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশয়-সন্দেহের অবকাশ নেই।

    সন্ত্রাসবিরোধী এই জোট কিন্তু আইএস কিংবা আল-নুসরা ফ্রন্ট বিরোধী জোট নয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গঠিত এই জোটের নেতৃত্বে থাকা সৌদি আরব নিজেদের সন্ত্রাসী রূপে ইতিমধ্যে প্রমাণ দিয়েছে। বাহরাইনে সৌদি সেনাবাহিনী ঢুকে  নির্বিচারে শিয়া হত্যাযজ্ঞ সহ গত নয়মাসব্যাপী “অপারেশন ডিসাইসিভ স্টম” নামক সন্ত্রাসী কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী শিয়া প্রধান ইয়েমেনে। সৌদি আরবের এই নিষ্ঠুর সামরিক অভিযানে এযাবৎ ইয়েমেনে ছয় হাজারেরও অধিক নিরপরাধ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। সেই সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী জোট! ভূতের মুখে রাম নাম বলেই প্রতীয়মান। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের পরম মিত্র সৌদি আরব। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য-লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় রাশিয়া সহ তার শিয়াপন্থি মিত্র দেশসমূহকে উচিৎ শিক্ষা দেয়া। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দুই অক্ষশক্তির একচেটিয়া আধিপত্যে চরম আঘাত হেনেছে। সেই অভিঘাত থেকে রক্ষা পেতে দুই অক্ষশক্তি রক্ষাকবচ রূপে মিত্র সৌদি আরবকে দিয়ে এই সুন্নি প্রধান জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমানে সবচেয়ে চরম সন্ত্রাসী আইএস কিংবা সিরিয়ার বাশার আল আসাদ বিরোধী সন্ত্রাসী আল-নুসরা ফ্রন্টের নাম মুখে তোলেনি সৌদি নেতৃত্বের এই জোট। যদিও নামকরণ করেছে “সন্ত্রাসবিরোধী” জোট। এই সন্ত্রাসবিরোধী জোট আইএস এবং আন-নুসরা ফ্রন্ট বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। এটা জলের ন্যায় পরিষ্কার। কুখ্যাত ঐ দুই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি, লালন-পালন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল। সুন্নি মতাবলম্বী আইএস বিরোধী ভূমিকায় সৌদি নেতৃত্বের এই জোট ন্যূনতম কার্যকরী ভূমিকা পালনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ শিয়া সংখ্যাধিক্য এবং রাশিয়ার মিত্র দেশসমূহের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই গঠন করা হয়েছে। এই জোটের কর্মপন্থা এখনও পর্যন্ত অনির্ধারিত। ইয়েমেন আগ্রাসনে সৌদি আরব পাকিস্তানকে সঙ্গী করতে পারে নি। এই জোটে অংশগ্রহণের প্রশ্নেও পাকিস্তানের অবস্থান দোদুল্যমান। যদিও জোট ভুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেনি পাকিস্তান। তবে জোটের কর্মসূচী-পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হবার বিষয়ে বিস্তারিত জানা ও বোঝার অপেক্ষার কথা প্রকাশ করেছে।

    গত অর্ধশতাব্দী ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সকল অশান্তির মূলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল। রাশিয়ার পরাশক্তিরূপে নতুনরূপে আবির্ভাবে দুই অক্ষশক্তির কর্তৃত্ব এখন হুমকির কবলে। শিয়া-সুন্নি বিরোধ সৃষ্টি করে পরস্পরের বিরুদ্ধে একে-অন্যকে লেলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ফায়দা হাতানোর নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে দুই অক্ষশক্তির প্রধান মিত্র সৌদি আরবের হাতে নেতৃত্ব অর্পণ করে অপরাপর মিত্র দেশসমূহকে শামিল করে মহাপরিকল্পনার ফাঁদ এঁটেছে। ইসরাইল তার ভূখণ্ডকে আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা বহুপূর্বে নিলেও; সেটা বাস্তবায়ন করতে পারে নি। সেই মহাপরিকল্পনায় বৃহৎ ইসরাইলি রাষ্ট্র গঠনে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ, জর্ডান, লেবানন, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, কুয়েত, তুরস্ক সহ সৌদি আরবের ভূখণ্ড নিয়ে বিশাল ইসরাইলি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার অংশ রূপে আইএস এবং আন-নুসরা ফ্রন্টকে সামরিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মাঠে নামিয়েছে। সঙ্গে চিরসখা যুক্তরাষ্ট্র তো রয়েছেই। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি সেই মহাপরিকল্পনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে রাশিয়াসহ তার মিত্র শিয়া প্রধান দেশসমূহকে সমূচিত জবাব দিতেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সুন্নি প্রধান এই জোট গঠনে সৌদি আরবকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছে। রাশিয়ার শক্তিমত্তার তুলনায় তুচ্ছ তুরস্ককে পর্যন্ত দুই অক্ষশক্তি লেলিয়ে দিয়েছে রাশিয়াকে হয়রানি করার অভিপ্রায়ে। তুরস্ক কার ইঙ্গিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ধৃষ্টতামূলক অপকীর্তি করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে? সেটা বিশ্ববাসীর নিশ্চয় অজানার বিষয় নয়।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ কেন এই ফাঁদে পা দিল? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এই মাসে আমরা নিশ্চয় বিস্মৃত নই একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের ভূমিকায়? ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি তো পরের কথা স্বীকার পর্যন্ত করে নি। সেই সৌদি আহবানে এত দ্রুত এই হীন সিদ্ধান্ত কেন নিল সরকার। জনশক্তি রপ্তানির মূলো দেখিয়ে কি সহজে বাংলাদেশকে কাৎ বা রাজি করা হয়েছে? সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে পুরুষ নয়, নারী কর্মী চাওয়ার কথা বলে এসেছে। সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক পরিবেশে আমাদের নারীরা কতটুকু নিরাপদে শ্রম বেচতে পারবে? সেটাও শঙ্কার বিষয় নিশ্চয়। অনাচারী সৌদি আরবে অনেক দেশ নারী কর্মী পাঠানো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা কেন আমাদের নারীদের সম্ভ্রম-মর্যাদা হারানোর বিপদের মুখে ঠেলে দিতে সৌদি আবদারে তাৎক্ষণিক রাজি হয়ে গেলাম! সৌদি আরবের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী জোটে অংশ গ্রহণে দেশবাসী-জনগণের মতামত নেয়া তো বহু পরের কথা-জাতীয় সংসদে পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি সরকার। কোনরূপ চিন্তা, আলাপ-আলোচনা ছাড়াই হুট করে অতীতে ইয়েমেনের অনির্বাচিত সরকারের পতনে সৌদি সামরিক জোটে যোগ দিয়েছিল সরকার। এবারও দেশ-জাতিকে অবগত না করে নীরবে প্রস্তাবিত সন্ত্রাসবিরোধী জোটে নাম লিখিয়েছে। এই স্বেচ্ছাচারী ধারা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পাকিস্তানের এজাতীয় অভিজ্ঞতার পরিণতি থেকে সরকারের শিক্ষা নেয়া আশু কর্তব্য বলেই মনে করি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধান সহ মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা পরিপন্থি। সরকারের এই হটকারী সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে হতবাক করেছে। এত তাড়াহুড়োয় জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত যে-সরকারই হোক-নেবার অধিকার রাখে না। সরকারের চরম হটকারী-স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাই। পাশাপাশি সরকারের আশু মোহ মুক্তি ঘটবে বলেই প্রত্যাশা করছি। পুরো জাতিকে কলঙ্কের মুখে ঠেলে দেবার অধিকার কোনো সরকারের নেই। এবং থাকারও কথা নয়। দেশবাসী চায় অনতিবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলি মহাপরিকল্পনার সৌদি নেতৃত্বের এই সন্ত্রাসবিরোধী জোট থেকে বেরিয়ে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে সরকার।
.................................................................................
মযহারুল ইসলাম বাবলা
লেখক, প্রাবন্ধিক
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত।