জাতীয় মুক্তির ইশতেহার

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন
jatiomukti_rafin

দরকষাকষির মাধ্যমে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ২৪ বছরের পাকিস্তানি নয়াঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে রেহাই পেলেও বাংলাদেশের জনগণের জাতীয় মুক্তি আজো অর্জিত হয়নি। ক্ষমতায় শাদা সায়েবদের জায়গায় বাদামী সায়েব আর বাদামী সায়েবদের জায়গায় কালো সায়েবরা এসেছে। কিন্তু নবগঠিত রাষ্ট্র চরিত্রগতভাবে ঔপনিবেশিক-সামন্তীয়ই রয়ে গেছে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে লুন্ঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো, তা আজো অব্যাহত আছে, শুধু ২০১৩ সালেই ৭৬০০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার করে দেয়া যার প্রমাণ। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের নামে আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটানো হলেও অচিরেই প্রমাণিত হয় অই উদারনৈতিক গণতন্ত্র আসলে বেসামরিক স্বৈরাচারেরই প্রতিশব্দ মাত্র। সব সরকারই বাংলাদেশে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থ ধারাবাহিকভাবে নিরাপদ রেখেছে। ইচ্ছেকৃতভাবে লোকসান দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা বন্ধ করেছে। ক্ষুদ্র ঋণের নামে গ্রামের গরিবদের শোষণ করছে। গার্মেন্টস শিল্পের নামে সস্তা শ্রমশোষণের দাসশিবির বানিয়েছে। সেখানে দুইদিন পরপর শ্রমিকদেরকে কাঠামোগতভাবে হত্যা করছে, জীবিতদের বাধ্য করছে নিম্নতম মজুরি ও মানবেতর পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করতে। কৃষকদেরকে ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করছে, কৃষি উদ্বৃত্তের প্রায় পুরোটাই পকেটস্থ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা, অথচ কৃষি উদ্বৃত্তই সকল উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেই শিল্পের ভিত গড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। বেসরকারিকরণ এবং বাণিজ্য উদারীকরণের নামে বস্তুত বহুজাতিক পুঁজির হাতে বাংলাদেশের বাজার তুলে দিয়েছে, তুলে দিচ্ছে জাতীয় সম্পদ। মার্কিন স্বার্থে টিকফা চুক্তি করেছে, ভারতীয় স্বার্থে সুন্দরবন ধবংসকারী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছে, রূপপুর বিদ্যুকেন্দ্র বানাচ্ছে রাশিয়ার স্বার্থে, চট্টগ্রামে চীনা ইপিজেড বানাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এক প্রকারের সামরিক শাসন চালাচ্ছে, ইচ্ছেকৃতভাবে সেটেলার সমস্যা তৈরি করে আদিবাসীদের জমিজমা দখল করার মাধ্যমে তাদের সাথে বাঙালিদের বিরোধিতা তৈরি করছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। সারা দেশে চলছে নদী দখল জমি দখল, শিক্ষাব্যবস্থার শোচনীয় অবস্থা, আর নারী নিরাপত্তা শূন্যের নিচে চলে গেছে। ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এবং এই শাসকগোষ্ঠী এতোটাই লুম্পেন যে নির্বাচন নামের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি পর্যন্ত এরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে না, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামের অদ্ভূত এক ধারণা তৈরি করা হয়েছে।

বোঝাই যাচ্ছে রাষ্ট্র জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পাশে পেয়েছে বিদেশী পুঁজি আর সামরিক বাহিনীকে। এই অবস্থায় জাতীয় মুক্তি অর্জন কি সম্ভব?

হ্যাঁ, যদি জনগণ সে-জন্য সংগ্রাম করে, এবং যে-কোনো ধরণের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে। রাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিলেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, চেষ্টাও করছে না, আমাদের লুম্পেন শাসকরা জাতি বলতে নিজেদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে বোঝে। নিরাপত্তার মোহে আমরা যদি স্বাধীনতা বিকিয়ে না দিতে চাই, তাহলে, জাতীয় মুক্তির জন্য আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হবে।

জাতীয় মুক্তি অর্জনের জন্য যা করতে হবেঃ

১. কাঠামো: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি নয়াঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকে আমরা যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠান “উত্তরাধিকার সূত্রে” লাভ করেছি তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যাচাই করতে হবে। এগুলো প্রণীত হয়েছিলো জনগণকে শোষণ-পীড়ন করার জন্য, তাই, এসবের মধ্যে যেগুলো জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যহীন তা বাতিল করে দিতে হবে, নতুন আইন-প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান কতোটা গণবিরোধী ও স্বৈরাচারী প্রক্রিয়ায় প্রণীত হয়েছিলো, তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে ফিরোজ আহমেদের “বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রের গতিমুখ: সূচনাকাল” প্রবন্ধে (সর্বজনকথা, ১ম বর্ষ: ৩য় সংখ্যা, মে ২০১৫), আর এই সংবিধানের গণবিরোধী অংশগুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন কর্তৃক প্রকাশিত “বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা” (২০১৪) পুস্তিকাটিতে। অতএব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান সভা প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে এবং সেই সংবিধান চূড়ান্ত হওয়ার আগে জনগণকে সক্রিয়ভাবে সংবিধান পর্যালোচনা করার সুযোগ দিতে হবে। এক ব্যক্তির হাতে (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী) যাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে না পারে সে-জন্য বিচার বিভাগ শাসন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সাংবিধানিকভাবেই ক্ষমতা বন্টন করতে হবে। স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যারা ন্যুনতম খরচে সকল প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ভার বহন করে নির্বাচনকেন্দ্রীক পেশিশক্তি প্রদর্শন ও কালো টাকা ছড়ানো বন্ধ করবেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সর্বত্র স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে হবে।

২. নীতি: বাংলাদেশের সমস্ত নীতি জাতীয়ভাবে প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিওর পরামর্শ অনুসারে গণবিরোধী নীতি প্রণয়ন করা বন্ধ করতে হবে। জাতীয় বিকাশ ঘটানো হবে সমস্ত নীতির মূল লক্ষ্য।

৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: একটি শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনের জন্য সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে শিক্ষিত ও সুস্থ জনগোষ্ঠী। অথচ বহুজাতিক পুঁজি এবং লুন্ঠনের স্বার্থে এই দুটি খাতই সবচেয়ে অবহেলিত রাখা হয়েছে। সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মান অবর্ণনীয়। বেসরকারিকরণের নামে চলছে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের স্বার্থে ব্যবসা, সেখানে শিক্ষা অধিকার ও স্বাস্থ্য অধিকার পেতে হলে যেই অর্থ লাগে, তা অধিকাংশের নেই। পাঠ্যবইগুলোর বিষয়বস্তুতে ঔপনিবেশিক-সামন্ত মানসিকতা দৃষ্টিকটুভাবে লক্ষ্যণীয়। শিক্ষার মূল্য উদ্দেশ্য মানবিক বোধের বিকাশ ঘটানো, এখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেরাণী তৈরি করা, ব্রিটিশ আমল থেকেই। মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা পদ্ধতির বিকল্প নেই, কিন্তু ফেল বা এফ গ্রেডের প্রথাটা পীড়নমূলক, এটা শিক্ষার্থীর ওপর অহেতুক মানসিক চাপ তৈরি করে এবং কৌতূহলী মানসিকতার পরিবর্তে যেনোতেনোভাবে হলেও পাশ করার মানসিকতা তৈরি করে। প্রশ্নফাঁসের পেছনে প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দায়ী হলেও পরোক্ষভাবে এই মানসিকতাও দায়ী। আবার গাইড ব্যবসা কোচিং ব্যবসার মূলও এটাই। এই শিক্ষা উদ্যোক্তা হতে প্রেরণা দেয় না, সাহিত্য বা বিজ্ঞান চর্চাকে কাঠামোগতভাবেই নিরুৎসাহিত করে, সৃষ্টিশীলতাকে হত্যা করে। শিক্ষা ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক-সামন্তীয় চরিত্রকে বদলে ফেলতে হবে, নতুন গণশিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা হবে সৃষ্টিশীল-আনন্দপূর্ণ ও আর্থনীতিক উৎপাদনের সাথে যুক্ত। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষকদের বেতনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বহুজাতিক পুঁজির মুনাফা সর্বোচ্চকরণ লক্ষ্যের বিপরীতে সুস্থ জনগোষ্ঠী গঠনের লক্ষ্যে মানসম্মত গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

৪. কৃষি ও শিল্প: ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষককে জমি দিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কিনতে হবে। কৃষি উদ্বৃত্ত থেকে শিল্পের ভিত গড়তে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ করা সম্ভব না হলেও এই ফড়িয়া শিল্প থেকে বেরোনোর চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। গার্মেন্টস মালিকপক্ষকে মজুরি বৃদ্ধিতে বাধ্য করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ কর্ম পরিবেশ। বর্ধিত মজুরি শ্রমিকদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যে বিপুল চাহিদা তৈরি করবে তা নতুন শিল্পের ভিত তৈরি করবে। মধ্যবিত্তের বেকারত্ম সংকটের সমাধানও নিহিত আছে এইখানে, নতুন নতুন শিল্পকারখানা মধ্যবিত্তেরও কর্মসংস্থান করবে।

৫. বাণিজ্য ও জাতীয় সম্পদ: আমাদের জাতীয় বিকাশের উপযোগী বাণিজ্য নীতি লাগবে। বাংলাদেশের বিরাজমান বাণিজ্য হচ্ছে সস্তা শ্রম কর্তৃক উৎপাদিত পণ্য রফতানি করা এবং বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থে অজস্র অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করা। এটা পাল্টাতে হবে। দেশীয় শিল্প ও ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। অধিকাংশ পণ্য যাতে আমরাই উৎপাদন করতে পারি। বৈদেশিক ঋণ আর প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের নামে বাংলাদেশকে আর্থনীতিক নয়াউপনিবেশে পরিণত করা ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে। ভিনদেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক বন্ধুত্ব, আর সেই কারণেই শক্ত দেশীয় বাণিজ্যিক ভিত্তি লাগবে, কারণ অধীন অবস্থানে থেকে বন্ধুত্ব হয় না। বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ বহুজাতিক পুঁজির হাতে তুলে দেয়া এই দেশের লুম্পেন শাসকদের সকল দলের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এটা সম্ভবত জাতির বিরুদ্ধে তাদের নিকৃষ্টতম অপরাধ। তেল, গ্যাসসহ নানাবিধ খনিজ সম্পদ জাতীয় সম্পদ যা সংরক্ষণ জাতীয় মুক্তির অপরিহার্য অংশ। এই সম্পদ জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। সেই জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতের লুটপাট বন্ধ করতে হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প অনুসন্ধান করে সেই অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে, এবং বাংলাদেশের বন্দরের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

৬. প্রতিরক্ষা: বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, দুর্ভাগ্যবশত, শুরু থেকেই ঔপনিবেশিক-সামন্তীয়। তাই জনগণের সাথে সশস্ত্র বাহিনীর দূরত্ব রয়েছে। আশির দশকের সামরিক শাসন দূরত্ব আরো বাড়িয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এই বাহিনীকে আজো ব্যবহার করা হচ্ছে, আদিবাসীদের বিরুদ্ধে। গণতন্ত্রের নামে বেসামরিক স্বৈরাচারের আমলেও ব্যবসায়িক তৎপরতায় লিপ্ত হওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে এই বাহিনীর চরিত্র আরো গণবিরোধী হয়েছে। এই বাহিনীর ভেতরে থাকা অফিসার এবং সিপাহীদের অনেকেই জাতীয় মুক্তির পক্ষে থাকতে পারেন, কিন্তু, সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিক্রিয়াশীল। জাতীয় মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক-সামন্তীয় এলিটিস্ট সশস্ত্র বাহিনীর বদলে গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, সেই লক্ষ্যে, সকল সক্ষম নাগরিককেই আবশ্যিকভাবে সামরিক শিক্ষা দিতে হবে। যাতে করে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদীরা বাংলাদেশে সামরিক আগ্রাসন চালালে জনযুদ্ধের মাধ্যমে তাদেরকে মোকাবেলা করা যায়।

৭. সংস্কৃতি: জাতীয় মুক্তির জন্য আবশ্যক একটি জাতীয় সংস্কৃতি। এটি হবে গণতান্ত্রিক, চরিত্রগতভাবে সামন্তবাদবিরোধী, এবং উপনিবেশবাদবিরোধী। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করতে হবে, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং অর্পিত সম্পত্তি আইনের মতো চরম অগণতান্ত্রিক বিধান বাতিল করতে হবে। ধর্ম নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে স্বীকৃত হবে, যাঁরা কোনো প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস করেন না, তাঁদেরও অবিশ্বাসী হিসেবে নাগরিক অধিকার থাকবে। যুদ্ধাপরাধী ও গণশত্রুদের সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার হরণ করতে হবে, তাদের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে, যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করতে হবে। সাংবিধানিকভাবে শিক্ষাগত, বৈবাহিক ও আর্থনীতিক সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমানাধিকার স্বীকার করতে হবে। সমানাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক আইন বাতিল করতে হবে। ইহজাগতিক ও লৈঙ্গিক সমতার এই আদর্শের কথা শুধু সংবিধানে লিখে রাখলে কাজ হবে না, যাপিত জীবনেও যাতে তা প্রতিফলিত হয়, সেই সাংস্কৃতিক চর্চা সমাজে জারি রাখতে হবে। আদিবাসী সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংবিধানিকভাবে অবাঙালি ও আদিবাসী নাগরিকদেরকে তাঁদের জাতিগত ও ভাষিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। আধুনিকতার নামে পশ্চিমা বলিউডি সংস্কৃতি এবং ইসলামের নামে আরব সংস্কৃতির আগ্রাসনের হাত থেকে জাতীয় সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হবে। এটা আইন করে হবে না, আগ্রহী সামাজিক উদ্যোগ লাগবে, বৃহত্তর সমাজের মধ্যে জাতীয় সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য তৃণমূল পর্যন্ত বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর ব্যাপক জোর দিতে হবে।

বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের লুম্পেন শাসকগোষ্ঠী এই জাতীয় মুক্তি অর্জনের প্রত্যক্ষ শত্রু, আর পরোক্ষ শত্রু তাঁদের পেছনে থাকা সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তি। এদের পতন ঘটানো জাতীয় মুক্তি অর্জনের পূর্বশত্রু। এই বিষয়ে সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশ নেই। এখানে সব বিষয়ে আলোচনা করা হয় নি। অনেককিছুই বাদ গেছে। লেখকের উদ্দেশ্য ছিলো একটা সাধারণ রূপরেখা তৈরি। মানুষের ভুল হতে পারে, আমার চিন্তার মধ্যে নানা সীমাবদ্ধতা আছে, সেই ক্ষেত্রে এটা নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ থাকছেই।

বাংলাদেশের জনগণকে- অর্থাৎ কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীকে- এই মুক্তি অর্জনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে লুম্পেন শাসকদের সংগ্রাম করতে হবে। সেই সংগ্রাম গণআন্দোলনের পথেই সফল হবে নাকি সশস্ত্রতার পথে যেতে হবে সেটা নিয়ে চিন্তা ভাবনার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ব্যক্তি, পাঠচক্র, সংগঠন, বিবিধ বামপন্থী রাজনৈতিক দল, প্রভৃতির প্রতি আন্তরিক আহবান জানাচ্ছি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে অনতিবিলম্বে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য।

 

লেখক: ইরফানুর রহমান রাফিন