উৎসব হোক সার্বজনীন

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল ২০১৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ন
bangla-new-year

পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে আমাদের নগরকেন্দ্রিক জীবনে উপচানো আবেগ উচ্ছাসের মাত্রাটা ভয়াবহ পর্যায়ে। উত্তোরত্তর সেটা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আবেগ উচ্ছাস জাতিগত বা সমষ্টিগত নয়, আত্মকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। স্বীকার করতেই হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ বাঙালির জীবনে এই দিনটির প্রভাব মোটেও বিস্তার লাভ করতে পারে নি। কারণটিও অস্পষ্ট নয়। কারণটি অর্থনৈতিক। সংস্কৃতি বিকাশে অর্থনীতির ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। নববর্ষ উদযাপন হতে সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে অর্থনৈতিক ভূমিকাই প্রধান। মতাদর্শিক লক্ষ্য-অভিপ্রায় বলে কিছু নেই। জাতিগত চেতনার বিপরীতে শ্রেণি ও আত্মকেন্দ্রিকতার বলয় গড়ে উঠেছে। বলয়টি অনিবার্যভাবে বৈষম্যকেই স্পষ্ট করে। বাঙালি দাবি নিয়ে নববর্ষের ভোগ-উপভোগে গা-ভাসিয়ে দিই। অথচ দিনটি গত হবার পর আর কেউ সেই দাবিটিকে চেতনায় ধারণ করি না। কার্যত উপেক্ষাই করে থাকি। 
 
ব্যক্তিগতভাবে এই ঢাকাতেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি মুসলমানদের বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে উৎসব-আনুষ্ঠানিকতার কোনোরূপ আধিক্য দেখিনি। সামাজিক এবং পারিবারিক কোনো ক্ষেত্রেই নববর্ষকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। বিচ্ছিন্নভাবে ছিল, তবে খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ে এদিনটি শুরু হত ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। যা আজও অভিন্নভাবে বলবৎ রয়েছে। আমার সহপাঠীদের বাড়িতে যেতাম এবং দেখতাম তাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে নববর্ষের উৎসবের আমেজ। মহিলারা স্নান শেষে নতুন শাড়ি গায়ে চড়িয়ে, শাখা, সিঁদুর লাগিয়ে হাতে আমের শাখা, ঘট ইত্যাদি পূজার উপকরণ নিয়ে অভুক্ত অবস্থায় ছুটতো মন্দিরের উদ্দেশ্যে। পূজা শেষে আহার করতো, তার পূর্বে নয়। বাড়িতে বাড়িতে উন্নত রান্না হত। অতিথি আপ্যায়নের জন্য দই-মিষ্টি, মৌসুমী ফলমূল সবাই বাড়িতে এনে রাখতো। ঐ দই-মিষ্টির আকর্ষণে হিন্দু সম্প্রদায়ের সহপাঠী বন্ধুদের বাড়িতে যেতাম দল বেধে। আরো দেখতাম মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ে একে-অপরের বাড়িতে যেতে-আসতে। অতিথিদের আসা-যাওয়া শুভেচ্ছা বিনিময় ইত্যাদি সামাজিকতা ছিল অনিবার্য। বন্ধুদের বাড়ির পর ছুটতাম হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসা কেন্দ্রে। ঐ মিষ্টির আকর্ষণে। ক্রেতা সেজে দর-দাম করামাত্র বিক্রেতা হাতে মিষ্টির ঠোঙা ধরিয়ে দিত। মিষ্টি হাতে পেয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে ছুটতাম অন্য দোকানে। দেখতাম পুরোহিত দিয়ে ব্যবসাকেন্দ্রে পূজা করানো, গীতা পাঠ, ধূপের ধোঁয়ায় পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ। ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য প্রার্থনা ইত্যাদি। অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের পারিবারিক ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি ধর্মযোগ ছিল অনিবার্য। নববর্ষের দিনটি তাদের ধর্মীয় আচারেরই অংশ। অতীতে যেমন ছিল, আজও তেমনি রয়েছে। বরং বৃদ্ধি পেয়েছে বললে ভুল হবে না। ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ যেকোনো মন্দিরে সকালে গেলে দেখা যায় হিন্দু সম্প্রদায়ে বৈশাখী পূজার আধিক্য।  
 
 
চৈত্র মাসের শেষ দিনে অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে লালবাগের শ্মশান ঘাটের পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে চৈত্র সংক্রান্তি মেলা হত। নাগরদোলা হতে বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে মেলার সামগ্রিক উপকরণের ঘাটতি ছিল না। রমরমা মেলা বলতে যা বোঝায় সবই ছিল ঐ মেলাতে। লালবাগ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় ঐ মেলাকে ‘চৈতপূজার মেলা’ নামে অভিহিত করতো। অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি মেলা এবং পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনিবার্য ছিল কেবল বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ। নগণ্য সংখ্যক বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ে হয়ত পালন হত। কিন্তু নববর্ষকেন্দ্রিক আচার-আনুষ্ঠানিকতা হিন্দু সম্প্রদায়ের একক আধিক্য ছিল স্পষ্ট। একারণেই পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলা নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতাকে হিন্দুয়ানি মোড়ক সেঁটে দেবার সুযোগ পেয়েছিল। নানা প্রচার-প্রচারণায় দিনটিকে হিন্দুদের ধর্মীয় পূজা-পার্বণের সঙ্গে তুলনা করতো। এটাও সত্য বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ে দিনটির গুরুত্ব-প্রভাব তেমন ছিল না। একমাত্র মুসলিম সম্প্রদায় ব্যবসা কেন্দ্রে হালখাতা নবায়ন, মৌলভী দিয়ে মিলাদ পড়ানো ছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে কোনো আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো না। বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়ে দিনটি ছিল সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত । তবে এর কারণও ছিল, সেটা অপ্রিয় হলেও সত্য; বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থ-বিত্তে, জমি-জমিদারিতে ছিল অগ্রসর। অপর দিকে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় ছিল পশ্চাৎপদ। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত হিন্দু মধ্যবিত্তের ছিল একক কর্তৃত্ব। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্বেই দেশভাগ গতি পেয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের সুযোগেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত হয়েছিল অবিভক্ত বঙ্গে। সেটা আরেক ইতিহাস। সেটা এই নিবন্ধের বিষয় নয়। বাস্তবতা হচ্ছে মধ্যবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উযাপন হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচারের অংশে পরিণত। ধর্মীয় বৃত্তের বাইরে নববর্ষকে বের করে আনা হয়ত সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নিশ্চয় নয়। 
 
 
আমরা জানি বঙ্গাব্দের প্রবর্তক ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। এক সময়ে এটি আকবরি সাল নামেও পরিচিতি পেয়েছিল। বাংলা-বাঙালির প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মানার্থে কিন্তু বঙ্গাব্দের প্রচলন করেননি সম্রাট আকবর। একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলার ঋতু-প্রকৃতিকে উপলক্ষ করে খাজনা আদায়। খাজনা আদায়ের মোক্ষম সময় বিবেচনায় বঙ্গাব্দের প্রচলন করা হয়েছিল। ভারতবর্ষে কৃষি অর্থনীতি বিকাশে আকবরের ভূমিকা নিশ্চয় রয়েছে। জমির পরিমাপ নির্ধারণসহ অনাবাদী জমিকে ফসল ফলানোর উপযোগী করতে তার কঠোর ভূমিকা ছিল। কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করেছিলেন কৃষকের স্বার্থে নয়, ভূমির রাজস্ব আয়ের পথটি সুগম করতেই। প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল কৃষকদের থেকে নিয়মিত খাজনা আদায়। মোগল রাজা-বাদশাদের রাজ্য দখল, লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বাৎসরিক নিয়মিত খাজনা প্রাপ্তির স্থায়ী আর্থিক মুনাফারি অভিপ্রায়ে ভূমি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। ব্যবস্থাটি কালক্রমে পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হয়ে স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। মোগল সাম্রাজ্যের অধীনের রাজ্যগুলোর রাজা-নবাবেরা অঞ্চলভিত্তিক জায়গীদার-জমিদার নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে কৃষক-প্রজাদের থেকে খাজনা আদায় করাতো। সামন্ত জমিদারেরা কৌশলে, শক্তিবলে, চরম নিপীড়নে কৃষকদের থেকে খাজনা আদায় করতো। রাজা-নবাবদের দাবি মেটাতে যুক্তিহীনভাবে নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বনে দ্বিধা করতো না। আদায়কৃত বাৎসরিক খাজনার নিজেদের ভাগের অংশ রেখে বাকি সমস্ত অংশ রাজা-নবাবদের নিকট পাঠাতেন। রাজা-নবাবেরাও অনুরূপ প্রাপ্ত খাজনা থেকে নিজেদের অংশ রেখে অবশিষ্ট অর্থ সম্রাটের দরবারে পাঠাতেন। রাজা-নবাবদের ধার্য করা বাৎসরিক খাজনা প্রদানে অসমর্থ জমিদারদের জমিদারীর অধিকার রাজা-নবাবেরা কেড়ে তার স্থলে অন্য জমিদার নিয়োগ দিতেন। জমিদারী রক্ষার তাগিদে জমিদারদের চরম নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হত হতভাগা কৃষক। এই খাজনা আদায় হত বৈশাখ মাসের শুরুতে। সেখান থেকেই বৈশাখ মাসের পহেলা তারিখের গুরুত্ব যেমন বাদশা, নবাব, জমিদার এবং অসহায় কৃষক সবার কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে চরম বৈপরীত্যে। একপক্ষ খাজনার অর্থে ভোগ-বিলাস করতো, অপরপক্ষ কৃষক-প্রজা শ্রমলব্ধ অর্থ প্রদান করে নিঃস্ব হত। অর্থনৈতিক শোষণের মোক্ষম সময়টিই নববর্ষ রূপে শাসকদের উৎসবে পরিণত হত। 
 
 
ইংরেজ কোম্পনির শাসনাধীনে বঙ্গদেশে পহেলা বৈশাখে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে জমিদারদের পুণ্যাহ উৎসবের আয়োজন হত। ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রহসন-প্রতারণার যুদ্ধে বিজয়ী ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজকর পরিশোধের চুক্তিতে মোগল বাদশাহ শাহ আলমের থেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী সনদ প্রাপ্ত হন। এই লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে পহেলা বৈশাখ শুভ পুণ্যাহ-এর সূচনা করেন। পুণ্যাহ হচ্ছে পহেলা বৈশাখে ভূমি রাজস্ব বিভাগের শুভ নববর্ষ। লর্ড ক্লাইভ শুরুতে নবাব আমলের জমিদারদের পরিবর্তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের উদ্যোগ নিলেও আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায়; পুনরায় স্থানীয় জমিদারদের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ইংরেজ আমলে জমিদার মাত্রই ছিল খাজনা সংগ্রাহক। নবাবের আমলের ন্যায় তাদের সম্মান-মর্যাদা বলে কিছু ছিলনা। তবে শাসক সহযোগী ভূমিকায় ইংরেজ শাসনের অনুগত্যে জমিদার শ্রেণি দেশবিরোধী অপকর্ম সংঘটনে দ্বিধা করতো না। ভারতবর্ষের দখলদারিত্ব নিশ্চিত হবার পর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার প্রবর্তন করে খাজনা আদায়ের অর্থনৈতিক শোষণ মূলক ব্যবস্থাটি চতুর ইংরেজ স্থায়ী করেছিল। 
 
 
কৃষককুলে পুণ্যাহ-এর নবর্বষের দিনটি সুখকর নিশ্চয় ছিল না। নিপীড়ক জমিদারেরা পুণ্যাহকে উৎসব অভিহিত করলেও সেটা কেবল জমিদার এবং ইংরেজ শাসকদের পুণ্যাহ উৎসব ছিল। কৃষক-প্রজাদের জন্য ছিল চরম দুঃখ-হতাশার দিন। খেয়ে না খেয়ে খাজনা প্রদানে তারা বাধ্য হত। নিরূপায়ে নানাভাবে নির্যাতিত-শোষিত হত। সেকালে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক মর্যাদা কিরূপ ছিল? জাত বৈষম্য কত নিষ্ঠুর ছিল? তারই একটি পুণ্যাহ উৎসবের নজির উল্লেখ করছি। পূর্ব বাংলার শিলাইদহ, সাজাদপুর, পতিসরের জমিদারী ছিল জোড়াসাঁকোরা ঠাকুর পরিবারের। কবি রবীন্দ্রনাথ প্রথম যখন জমিদারী দেখভালের উদ্দেশ্যে এখানে আসেন, তখন সময়টা ছিল পুণ্যাহ উৎসবের। জমিদারের কাছারি ঘর সাজানো হয়েছে প্রথানুযায়ী জাঁকজমকভাবে। জমিদারের কাছারি ঘিরে উলুধ্বনি শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত। জমিদারী সাজে রবীন্দ্রনাথ কাছারিতে প্রবেশ করে দেখলেন পুণ্যাহ উৎসবে আগতদের আসনের চরম বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। জেনে নিলেন আসন ব্যবস্থার বিভাজনের বিস্তারিত তথ্য। জমিদার মহাশয়ের জন্য ভেলভেটের রাজাসন, পাশে জমিদারের কর্মচারীদের আসন, ব্রাহ্মণদের জন্য আসন, হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষক-প্রজাদের জন্য সতরঞ্জি বিছানো আসন এবং বিশাল জায়গাজুড়ে খালি মেঝে। খালি মেঝে সম্পর্কে প্রশ্ন করে জানতে পারেন, ঐ খালি মেঝে মুসলমান কৃষক-প্রজাদের জন্য সংরক্ষিত। এবং এই ব্যবস্থা জমিদারীর শুরু থেকেই বলবৎ রয়েছে। আসন ব্যবস্থায় মর্মাহত কবি রবীন্দ্রনাথ এতটাই অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিলেন যে, নায়েবকে সরাসরি সকলের জন্য সমান আসন সাজাতে বলেছিলেন জমিদারী স্বভাবে-চরম আদেশের স্বরে। নায়েবের নানা আপত্তির পরও রবীন্দ্রনাথ আসন বৈষম্য নিরসন করেছিলেন। সকল সম্প্রদায়ের জন্য অভিন্ন আসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিজ জমিদারীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। নিজের আসন ত্যাগ করে কৃষক-প্রজাদের কাতারে বসে পুণ্যাহ অর্থাৎ খাজনা আদায় সম্পন্ন করেছিলেন। আমরা জানি কৃষি ব্যবস্থা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্ভাবনের নানা কথা। জমিদার কবি রবীন্দ্রনাথ-জমিদার ছিলেন বটে তবে প্রজাবিচ্ছিন্ন ছিলেন না। উদার-মানবিক কবি রবীন্দ্রনাথ জমিদারীতে ব্যর্থ হন নি, হয়েছিলেন প্রজাবান্ধব জমিদার। তাঁর অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি সর্বজনীন মর্যাদা লাভ করেছেন। সে মর্যাদা কখনো হানি হবার নয়।
 
 
লর্ড ক্লাইভের পুণ্যাহ সূচনা প্রকৃতপক্ষে বাংলা নববর্ষের বর্ষবরণের জন্ম কথা। ইংরেজ বিদায়ের পর বাঙালির সকল ক্রিয়াকর্মের মূলে দিনটির গুরুত্ব সম্পূর্ণরূপে ম্লান হয়ে যায় নি। নানা উপায়ে সেটা টিকে আছে। আজও দেখা যায় দেশের সমস্ত তহসিল অফিসসমূহে বঙ্গাব্দের অনুসরণে বাৎসরিক খাজনা আদায়ের নিয়ম-ব্যবস্থা। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্য কোনো ক্ষেত্রে বঙ্গাব্দের সন-তারিখের প্রচলন খুঁজে পাওয়া যাবে না। পহেলা বৈশাখ-এর দিনটি ব্যতীত দ্বিতীয় একটি দিনও নেই; যেটি বঙ্গাব্দের সন-তারিখের ভিত্তিতে পালিত হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সীমিত আকারে বাংলা নববর্ষ পালনের আনুষ্ঠানিকতা শহরকেন্দ্রিক শুরু হয়। এবং পর্যায়ক্রমে মাত্রাটা দেশের সমস্ত শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের মিডিয়া, কর্পোরেট পুঁজি, উৎপাদকেরা পণ্য বিপননে দিনটিকে ভোগবাদিতার চরমে নিয়ে গেছে। ঈদ বা শারদীয় পূজার কেনাকাটার থেকেও দিনটি ক্রমেই আরো অধিক বিস্তৃতি লাভ করেছে। জাতীয় দৈনিকে পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজনের বিজ্ঞাপনের ফাঁদে নববর্ষকেন্দ্রিক খাদ্য, পোশাক, ভোগ-বিলাসিতার এবং নানা পণ্যের প্রচারণার আধিক্য দেখা যায়। টিভি মিডিয়াতে ফ্যাশন শো’র সম্প্রচারও চলে। এগুলোকে সরলভাবে দেখার কিন্তু কারণ নেই। মানুষকে সুকৌশলে অসংযমি ভোগবাদিতার অভিমুখে ঠেলে দেবার নানা মতলব এতে আমরা প্রত্যক্ষ করি। যেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নগ্ন প্রকাশ বলেই শনাক্ত করা যায়। পণ্যের পসরা সাজিয়ে ভোগবাদিতার অভিমুখে ঠেলে দেবার নানা তৎপরতা নববর্ষ  উদযাপনে ক্রমে-ক্রমে যুক্ত হয়ে এখন অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছে। দিনটি নারী নিপীড়নের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে । জনজীবনের স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি হুমকির মুখে। বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির বিপরীতে উগ্র অপসংস্কৃতির আধিক্য আমাদের কোন্ পথে ঠেলে দিচ্ছে? সেটা কি আমরা বিবেচনা করি? থার্টি ফাস্টের উগ্রতা পহেলা বৈশাখে ভর করেছে, এই সত্যটি অস্বীকার করি কিভাবে!
 
 
বাঙালিয়ানা উৎসবের বিরোধিতা করছি না। তবে জাতিগত ঐক্যের জন্য দিনটি যে গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা অবশ্যই স্বীকার করি। এই উৎসবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুপস্থিতি জাতিঐক্যের প্রধান অন্তরায়। আমাদের শহর ও নগরকেন্দ্রিক মানুষের এই উৎসব সংখ্যাগরিষ্ঠদের স্পর্শ করে না। মোট জনসমষ্টির বিশ ভাগ মানুষ এই উৎসব পালন করে। বাকি আশি ভাগ মানুষ তাদের অর্থনৈতিক কারণে নীরব দর্শকমাত্র। জাতীয়তার মূল কেন্দ্রে ভাষা, ভাষা আমাদের নিকটবর্তী করে সত্য কিন্তু শ্রেণি প্রশ্নে দূরে ঠেলে দেয়। ঐ যে আশিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তারা তো তাদের শ্রেণিগত অবস্থানের কারণেই বাঙালিয়ানার এই উৎসবে শামিল হতে পারে না। বাঙালি জাতিগত ঐক্য-মিল শ্রেণি প্রশ্নেই বিচ্ছিন্নতার পথে ধরে। যতদিন সমস্ত জাতিসত্ত্বার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে নববর্ষ পালন করতে না পারবে ততদিন এই উৎসব জাতিগত সর্বজনীন উৎসব রূপে মর্যাদাবান হবে না। 
 
 
আমরা অহরহ এই দিনটিকে বাঙালির একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব বলে থাকি। সেটা যে কেবল বাকসর্বস্ব, তাতে দ্বিমতের সুযোগ নেই। আজও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় দিনটিকে কেন্দ্র করে পূর্জা-অর্চনার আনুষ্ঠানিকতা পূর্বের ন্যায় করে থাকে। অর্থাৎ হিন্দু সম্প্রদায়ে নববর্ষের সঙ্গে ধর্মযোগের বিষয়টি জাজ্বল্যমান। ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিন ধার্যকরণ বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় মেনে নেয় নি। তারা লোকনাথ পঞ্জিকা এবং গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব অনুসারে পালন করে। এতে প্রায়ই একদিন আগ-পিছ হয়। তারা ধর্মমতে এবং ধর্মযোগে নববর্ষ পালন করে থাকে। অনেকটা মুসলিম সম্প্রদায়ের কতিপয় যেমন সৌদি আরবে চাঁদ দেখা অনুযায়ী রোজা, ঈদ ইত্যাদি এদেশে পালন করে, তেমনই। একবার নববর্ষে কলকাতায় ছিলাম। দিনটিতে যত্রতত্র উৎসব-আনুষ্ঠানিকতা দেখিনি। নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখেছি। সেখানে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়কে কেবল নববর্ষ  উদ্যাপন করতে দেখে বাঙালি মুসলমানদের প্রশ্ন করে জেনেছিলাম; বাংলা নববর্ষ  বাঙালি মুসলমানেরা পালন করে না। নববর্ষকেন্দ্রিক হিন্দুদের পূজাসহ ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতার আধিক্যে তারা পহেলা বৈশাখ হিন্দুদের পার্বণ বলেই মনে করে। একমাত্র এই কারণেই পশ্চিম বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় নববর্ষ  উদ্যাপন করে না।
 
আমাদের তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনার কাছে পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা নববর্ষকে হিন্দুয়ানি প্রচারণা পরাস্ত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের সেই চেতনাকে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কেবল উৎসবে মেতে ওঠা, নববর্ষকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা, সেই চেতনাকে শাণিত করতে পারবে না। সর্বাগ্রে প্রয়োজন দেশপ্রেম এবং বিদ্যমান জনবিচ্ছিন্নতার অবসান। সেটা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে যেমন অনুরূপ শ্রেণি বিভাজনের বৃত্ত ভাঙারও। সারকথা কেবল অসাম্প্রদায়িক হলেই চলবে না। হতে হবে ইহজাগতিক এবং ধর্মনিরপেক্ষও। তাহলেই দিনটির অসাম্প্রদায়িক আবেদন সুরক্ষা হবে। জাতিগত একমাত্র এই উৎসব সর্বজনীন তখনই হতে পারবে যখন এ দিনের আবেদন সকল বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে একীভূত করা সম্ভব হবে। উচ্চ ও মধ্যবিত্তের সীমা ভেঙে সকল বাঙালির অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা যাবে; তখনই আমরা বলতে পারবো বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান- আমরা সবাই বাঙালি। একাত্তরে বাঙালির যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, স্বাধীনতার পরক্ষণে সেটা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐক্যের প্রধান অন্তরায় বিদ্যমান ব্যবস্থা। তাই ব্যবস্থাটির পরিবর্তনেই আমরা হারিয়ে যাওয়া ঐক্যকে ফিরে পাবো। আজকের দিনের সেটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। 
 
 
বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানস্থলে এযাবৎ হরেক অপ্রীতিকর-অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। এবং সেটা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায়। তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় দুর্বৃত্তদের নিলর্জ্জপনা প্রত্যক্ষ করলেওব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। নির্লিপ্ত পুলিশ সদস্যদের এজন্য জবাবদিহি করতে হয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই। এযাবৎ কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার দায়ে কোনো পুলিশ সদস্যকে শাস্তি পেতে হয়েছে, তেমন নজির  বোধকরি নেই। জনগণের অর্থে লালিত-পালিত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী জনগণকে নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। আমরা এই ব্যবস্থার অধীনে কেউ নিরাপদ নই। নববর্ষ  পালনে অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে সরকার বিকেল ৫টা থেকে সান্ধ্য আইন জারি করেছে। অর্থাৎ বিকেল ৫টার পরে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। সরকারের এই ঘোষণাকে কতিপয় দু®কৃতকারীর নিকট আত্মসমপর্ণ, বলা কি ভুল হবে? নশ্ছিদ্রি নিরাপত্তা বলয়ের নানা ঘোষণার পরও মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার বাধ্য হয়ে ব্যর্থতা ঘোচাতে সান্ধ্য আইনের ন্যায় বিকেল ৫টার পর সমস্ত অনুষ্ঠান, জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টি কারো বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। অথচ নববর্ষ  উপলক্ষে সর্বাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহ বিকেলেই হয়ে থাকে। এবার তা হবে না বা করতে দেয়া যাবে না। এটাই সরকারি সিদ্ধান্ত। 
 
 
বাংলা নববর্ষ  উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত সম্প্রীতির সম্ভাবনা নানা সঙ্গত কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করার রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নিশ্চয় কাক্সিক্ষত হতে পারে না। হাজার হাজার মানুষ এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া নারী নিগ্রহের ঘটনার এযাবৎ কাউকে শনাক্ত, বিচার ও শাস্তি পেতে হয় নি। তার দায় কি সরকারের ওপর বর্তায় না? অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া-ই কি সমাধান? সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মাথা ব্যথায় মাথা কাটার শামিল বলা কি ভুল হবে?
 
 
আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি বিশ্বায়ন নামক পুঁজিবাদী দৈত্যের আগ্রাসনের কবলে। এর থেকে ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ ঐ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত সংগ্রাম গড়ে তোলা। মুখে যতই বাঙালিয়ানার স্তুতি গাই-না কেন, কার্যক্ষেত্রে তার প্রমাণ দিতে হবে। আমাদের সকল সম্ভাবনা একে একে বিলীন হতে চলেছে। সেই সম্ভাবনা রক্ষায় আমাদের সমষ্টিগত ঐক্যের বড়ই প্রয়োজন। ঐক্য ছাড়া তো আমাদের সামনে বিকল্প কিছু নেই। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ঐক্য এবং ঐক্যই।
 
.................................................................................
মযহারুল ইসলাম বাবলা
লেখক, প্রাবন্ধিক
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত।