কাশ্মীর থেকে সুন্দরবন- দ্রুত ধেয়ে আসা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য চাই!

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন
kashmirtosundarban_pc

“নীসের মানুষদের জন্য শোক! ওঁলাদ সরকারের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ফ্রান্সের ছাত্র ও শ্রমজীবী জনগণের লড়াইয়ের সাথে সংহতি!”

বল আপাতত পুঁজিবাদী দুনিয়ার কোর্টে! ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের পতন ঠেকিয়ে রাখতে দুনিয়াব্যাপী হিংসা আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে নৈরাজ্যিক ফ্যাসিবাদ কায়েম এবং প্রক্সি ওয়ার ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে এরা এখনো পর্যন্ত সফল! এই নানা সভ্যতার-মতাদর্শের অনৈক্য আর দ্বন্দ্ব তত্ত্বকথার ধোঁয়াশায়, পুঁজিবাদের পতন ঠেকাতে জনগণের বিরুদ্ধে-পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদীদের শ্রেণীগত ঐক্যের চক্রান্ত থেমে নেই। গণশত্রু দের ঐক্যের চক্রান্ত চূর্ণ করতে নীস থেকে কাশ্মীর-সুন্দরবন পর্যন্ত তাই জনগণের ঐক্য জরুরী!

আর তাই! হেইট্রেড স্পিচের বেধড়ক উম্মাদনার ফাঁকে একটু ইরানের তাকাই। সেখানে গত মে মাসে আমরা দেখলাম ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইসলামোফোবিয়াকে পকেটে ফেলে রেখে ইরানের প্রতিক্রিয়াশীল ইসলামী মোল্লাতন্ত্রের ধারক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর সাথে মহামিলনের উপলক্ষ ঘটিয়েছেন। মহামিলনই বটে! গত মে-তে ৩ দিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ,ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রোউহানী এবং আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ডঃ মোহাম্মদ আশরাফ গণির মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় আন্তপরিবহন এবং ট্রানজিট চুক্তি (Trilateral Agreement on Establishing Chabahar Transport and Transit Corridors) স্বাক্ষরিত হয়। মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে গোটা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এক নতুন মাত্রা তৈরী করতে যাচ্ছে।

ইরানের সিস্তান বেলিচিস্তান প্রদেশ অবস্থিত এই চাবাহার বন্দরের ভূরাজনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের কাছ থেকে ল্যান্ড-এক্সেস না পাওয়ার কারণে আগফানিস্তানের ভেতর দিয়ে মধ্য এশিয়ায় খনিজ সম্পদ থেকে শুরু করে ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে সরাসরি প্রবেশের কোন রাস্তা ছিলনা ভারতের । এখন সাগর পথে পাকিস্তানকে বাইপাস করেই ভারত এই মহাগুরুত্বপূর্ণ করিডোরের নির্ধারক শরীক হিসেবে আবির্ভূত হল! সাথে সাথে পাকিস্তানের সাথে চীনের করিডর CPEC (Chine-Pakistan Economic Corridor) কে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করল এই অঞ্চলে আমেরিকার ঘনিষ্ট মিত্র ভারত। এই চুক্তির অধীনে ইরানের চাবাহার পোর্টে India Ports Global ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে দুটি কন্টেইনার বার্থ এবং ৩ টি মালটি কার্গো বার্থ তৈরীর জন্য কাজ করবে। ভারতের

রাষ্ট্রীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম IRCON International চাবাহার থেকে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের জাহেদান পর্যন্ত ৩০০ মাইল রেল রাস্তা তৈরী করবে যেটি যুক্ত হবে ইরানের রেল নেটওয়ার্কের সাথে। এর সাথে দ্বিতীয় একটি রেল লাইন হবে জাহেদান থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত। করিডরের ইরান অংশে এলুমিনিয়াম স্মেল্টিং,ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ইন্ডাস্ট্রি এবং এল-এন-জি প্ল্যান্ট করার পরিকল্পনা আছে এই চুক্তির আওতায়। এই পুরো প্রজেক্টের প্রাথমিক ফান্ড হিসেবে নয়া দিল্লীর ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রস্তাবের দিকে মুখিয়ে আছে ইরান! তেহরানের সাথে দিল্লীর এই,( নাকি হিন্দুত্ববাদের সাথে মোল্লাতন্ত্রের!! ) এই মহামিলন আজ থেকে ১৩ বছর আগেই ২০০৩ এ ঘটতে পারতো। কিন্তু ভারতের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সেইসময় ইরানের তিক্ত সম্পর্ক এই প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে নিয়ে যায়। গত ২০১৫ তে ইরানের সাথে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সাথে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পর এই অঞ্চলে ভূরাজনীতির হিসেব-নিকেশে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় । এই হিসেব নিকেশ যে কুটনৈতিক শর্ত তৈরী করে তাই আজকের ইন্দো-ইরানিয়ান চুক্তিকে সম্ভব করেছে। স্বভাবতই এই চুক্তিকে নিয়ে ওয়াশিংটনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কেননা এই ভু-রাজনৈতিক হিসেব নিকেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিভট টু এশিয়া’নীতির অন্তর্ভূক্ত ‘চীন ঘেরাও’কৌশলের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে সম্পর্কিত!

আগেই বলা হয়েছে ত্রিপক্ষীয় চাবাহার করিডোর চুক্তি, পাকিস্তানের সাথে চীনের করিডর CPEC (Chine-Pakistan Economic Corridor) কে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করল। এই চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির চ্যলেঞ্জ নয় তা বলাই বাহুল্য। চীনের কৌশলগত অবস্থানের প্রতিও এই চাবাহার করিডোর এক বড় চ্যালেঞ্জ। CPEC করিডরের পরিকল্পনায় আছে পশ্চিম চীন থেকে সোজা পাকিস্তানের গোয়াদার পোর্ট পর্যন্ত রেল পথ, সড়ক পথ এবং পাইপ লাইন। এই গাদার থেকে চাবাহার পোর্টের দুরত্ব মাত্র ৪৫ মাইল। ফলে মুম্বাই পোর্ট থেকে চাবাহার পর্যন্ত ভারতের এই আনাগোনায় গোয়াদার থাকবে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।

এছাড়া গোয়াদার আরো একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি চীনের বিখ্যাত কৌশলগত ঘাঁটি মুক্তোর মালা বা String of Pearls এর অংশ! এই মুক্তোর মালার একটি মুক্তো হল পাকিস্তানের গাদোয়ারে, একটি শ্রীলংকার হাম্বান্তোতায় এবং অন্যটি শ্রীলংকাতেই কলোম্বোতে নির্মাণাধীন । মায়ানমারে কায়াকপিউতে আরো একটি বন্দর নির্মাণাধীন এবং আরাকান থেকে একটি পাইপলাইন,রেল পথ মালাক্কা দিয়ে সোজা চীনের কুওমিন্টাং এ যাওয়ার কথা । এই মুক্তোর মালার সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের সোনাদিয়া বন্দর । কিন্তু বাংলাদেশ সরকার পরে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এখন এই অঞ্চলগুলোতে চীনের এই আপাত শক্ত ভূরাজনৈতিক অবস্থাকে অস্থিতিশীল করার কৌশল অবলম্বন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চাবাহার পোর্টে ভারতীয়দের অবস্থান এবং ভারত-ইরান-আফগানিস্তানের এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মার্কিন স্ট্র্যাটেজির সেবাই করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী সচিব নিশা দেশাই পরিস্কারভাবেই গত ২৪ মে এই চুক্তির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং বলেছেন, এই করিডোর ভারতের জ্বালানী চাহিদা ও পারস্য সাগরে তার প্রবেশের জন্য জরুরী ছিল। আপাতত মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে একদিকে মার্কিন-ভারত অক্ষ অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান দেখা গেলেও এই সাম্রাজ্যবাদীদের এই দ্বন্দ্ব যে খুব সরল পথে এগুবে তা একেবারেই বলা যায়না । বরং এটি সম্পন্ন হবে নৃশংস নৈরাজ্যিক ছায়া যুদ্ধের(Proxy war) এর মধ্যে দিয়ে। কারণ ,এটি খেয়াল রাখা দরকার চীন হল ইরানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার ।দু পক্ষের মধ্যে লেনদেন ইতিমধ্যেই ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে । অবরোধ উইথড্র করার পর ইরানের জন্য বিরাট অংকের বিনিয়োগের থলি নিয়ে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট। এই গত ফেব্রুয়ারীতে চীন-ইরান কে সংযোগকারী রেললাইন দিয়ে পূর্ব জেই জিয়াং প্রদেশ থেকে ৩২ টি কন্টেইনারবাহী ট্রেন কাজাখাস্থান এবং তুর্কেমিনিস্তানের মধ্যে তেহরানে পৌঁছেছে। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (OBOR) পরিকল্পনায় ইরানকে অংশীদার হিসেবে চায় চীন। আফগানিস্তানের অবস্থাও তথৈবচ। চীনে আফগানিস্তানের দুত মোসাজাই ঘোষণা করেছেন, চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে CPEC (Chine-Pakistan Economic Corridor) তে যুক্ত হতে চায় আফগানিস্তান। উগ্র ইসলামিস্ট এবং জাতীয়তাবাদী গ্রুপ East Turkestan Islamic Movement (ETIM) কে দমন করার জন্য বেইজিং এর সাথে যৌথ অপারেশন চায় আফগানিস্তান। আবার আমরা এও জানি , East Turkestan Islamic Movement (ETIM) কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে ফান্ডিং করছে চীনের পশ্চিম প্রদেশে অন্তর্ঘাত তৈরী করার জন্য। নিজেদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থে এই ধরণের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার অসংখ্য উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুগ যুগ ধরে দিয়ে আসছে। গত ২১ মে মোদী যেদিন ইরানে পৌঁছুলেন ঠিক সেইদিনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে বেলুচিস্তানে ড্রোন হামলা চালিয়ে তালিবান নেতা মুল্লাহ আকতার মনসুরকে হত্যা করে। প্রসঙ্গত,ইসলামী জঙ্গীবাদীদের উত্থান এবং পতন এর সাথেই যে সামাজ্যবাদীদের ভূরাজনৈতিক কৌশলের সম্পর্ক আছে- এই কথা বললেই তথাকথিত জঙ্গীবিরোধীদের এলার্জি দেখা দেয়। ফ্র্যাঙ্কেনস্টেইন তৈরী এবং কাজ ফুরোলে ফ্র্যাঙ্কেনস্টেইনদের হত্যা করার এই মার্কিনী স্টাইলের দিকের দৃষ্টি দেয়ার কোন প্রয়োজন, এই তথাকথিত জঙ্গীবিরোধীরা বোধ করেননা। এই অন্তর্ঘাত এবং প্রক্সি ওয়ারের নৃশংস চেহারা মধ্যপ্রাচ্য দেখছে যুগের পর যুগ। এই মুহূর্তে চাবাহার করিডোরকে ঘিরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এই নৈরাজ্যিক যুদ্ধের সম্প্রসারণ হচ্ছে।

কাস্মীর পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলী (অথবা বাংলাদেশ) স্টাইলে নরেন্দ্র মোদীর ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং:

CPEC এবং চাবাহার করিডোরের দ্বন্দ্বের সাথে কাশ্মীরের পরিস্থিতির সম্পর্ক কি? CPEC (Chine-Pakistan Economic Corridor) র রূট ম্যাপ খেয়াল করলে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে CPEC চীনের জিঞ্জিয়ান প্রদেশ থেকে পাকিস্তানের সর্ব-দক্ষিণের প্রশাসনিক এলাকা গিলগিট-বালিস্তান দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। এই গিলগিট বালিস্তানের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমেই ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাস্মীর। ভারতীয় সেনাবাহিনী যেখানে নিয়মিতভাবেই গণহত্যা-ধর্ষণ-দখলদারিত্ব চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি ভারত সরকার কাশ্মীরে দখলদারিত্বের ক্ষেত্রে ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর কৌশল নিয়েছে। এই সংক্রান্ত ‘জেরুজালেম পোস্টে’র শিরোনামটি লক্ষণীয়- India sparks anger with 'Israel-style' settlement policy in disputed Kashmir”। ভারতের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদ্বৃতি দিয়ে আমাদের পত্রিকাটি জানাচ্ছে, ১৯৮৯ সালে নয়াদিল্লীর শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে তুঙ্গে ওঠা সশস্ত্র সংগ্রামের পরিস্থিতে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ হিন্দু কাশ্মীর থেকে পালিয়ে এসেছিল। সেই পালিয়ে যাওয়া অধিবাসীদের আবার কাশ্মীরে ফেরত পাঠাবে মোদী সরকার। এজন্য কড়া নিরাপত্তাধীন এলাকা জুড়ে ৩ টি শহরতলী করার পরিকল্পনা করেছে তাঁরা। হুরিয়াত কনফারেন্স এর সর্বোচ্চ নেতা সাইদ গিলানি এর বিরোধিতা জানিয়ে বলেছেন যে, হিন্দু পন্ডিতদের অবশ্যই কাশ্মীরে ফিরিয়ে আনতে হবে কিন্তু এইভাবে ইসরায়লী কায়দায় কৃত্রিম শহরতলী তৈরী করে নয়, প্রদেশের ভেতর প্রদেশ তৈরী করে নয়, বিভেদের যড়যন্ত্র তৈরী করে নয়! এবং সবচেয়ে বড় কথা এই সরকারী পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন খোদ কাশ্মীরের হিন্দু পন্ডিতেরা। কাশ্মীর পন্ডিত এসোসিয়েশনের সভাপতি সঞ্জয় তিকো বলেছেন যে ,এটি হিন্দু পন্ডিতদেরকে আরো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। সরকার এই পরিকল্পনা আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। প্রসঙ্গত , এই কৌশল বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলী ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর কৌশল হিসেবে চিহ্নিত হলেও আমরা জানি বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও শাসকশ্রেণী পার্বত্য চট্টগ্রামেও এই ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্টিকে কোণঠাসা করার এই পাঁয়তারা অনেক আগে থেকেই করছে।

 

বিজেপি সরকারের এই পরিকল্পনার সাথে CPEC (Chine-Pakistan Economic Corridor) র কোন সম্পর্ক নেই তা কোনভাবেই বলা যায়না। আমরা আগেই দেখেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে চীনের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাত চালাতে East Turkestan Islamic Movement (ETIM) কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে ফান্ডিং করছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরেও এই ধরণের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাতে সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়া রাশিয়ার চেচেন এবং ককেশাস ইসলামিস্ট গ্রুপগুলোকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে । মার্কিনী এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভারত চীনের শাকশাগাম ভ্যালী, আজাদ কাস্মীর, গিলগিট বালিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীর সহ এই বিস্তৃত এবং বহু বিতর্কিত সংঘাতময় অঞ্চলেকে ঘিরেও এই পরিকল্পনা নেবেনা যেটি মনে না করাটা পরিস্থিতির ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থাকার সামিল। একই পরিকল্পনা পাকিস্তানের দিকে থেকেও হতে পারে। যেদিক থেকেই হোক এর নৃশংস নির্মম বলী হচ্ছেন কাশ্মীরের জনগণ! কাশ্মীরের জনগণ ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা সাম্রাজ্যের এই নোংরা খেলার বাইরে থাকতে চান! তাঁরা চান স্বাধীন সার্বভৌম কাশ্মীর। লড়াইটা তাই এই সামগ্রিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই করাটা জরুরী।

সুন্দরবন বাঁচানোর লড়াই- ভারতের সাম্রাজ্যিক আকাংখার বিরুদ্ধে লড়াই:

সুন্দরবনের রামপালে কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণকে কেউ যদি ভারতের এই বিস্তৃত সাম্রাজ্যিক পরিকল্পনার বাইরে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থ থেকে বিবেচনা করেন, তাহলে তাকে তাকাতে হবে ১২ মার্চ-১৪ মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনে সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ যৌথ সামরিক মহড়ার দিকে। ‘সুন্দরবন মৈত্রী’ নামে ৩ দিন ধরে চলা এই মহড়ার ঘোষিত লক্ষ্যের মধ্যে ছিল,সুন্দরবনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ করা, পুরো এলাকায় ২ পক্ষ থেকেই ব্যাপক পেট্রোলিং বাড়ানো, বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্র রুটে সন্দেহভাজন কার্গো রেইড করা ইত্যাদি। মহড়ার দ্বিতীয় দিনে হরিয়াভাঙ্গা এবং রায়মঙ্গল নদীতে রেইড করার মহড়া দেয় ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি কার্গো। ভারতের মত একটি দেশ যারা মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে আগামী দিনে একটি প্রভাবক ভূমিকা রাখবে, তাঁরা শুধুমাত্র মধ্য প্রদেশের একটি বাতিল প্রজেক্টের চালানোর জন্য, কি শুধু বিদ্যুতের জন্যই সুন্দরবনের মত একটি সংবেদনশীল জায়গার কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে এই অঞ্চলে ভারতবিরোধী মনোভাবে ফুয়েলিং করবে, ভারতের কুটনীতি এবং সমরনীতির ইতিহাস সে কথা বলেনা!

সুন্দরবনের এই যৌথ মহড়ার সাথে অবশ্যই যুক্ত কুয়াকাটার কাছে পায়রা বন্দরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে ভারতের পদক্ষেপ । এই প্রকল্পের জন্য ভারতের ১৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে খোদ ভারতের সংবাদপত্রেই উচ্ছ্বাসের ঘটনাবলী। আওয়ামী সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পের অন্যতম পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর। ইতিমধ্যেই বেলজিয়ান একটি কোম্পানির সাথে পিপিপির ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি করা হয়েছে। বিনিয়োগের ইঁদুর দৌড়ে আছে চীন ,ভারত, বেলজিয়াম,নেদারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র। আমরা জানি এর আগে সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য.চীনের ফিজিবিলিটি স্টাডি আর ৯৯% ফান্ডিং এর অফারের পরও হঠাৎ করেই আওয়ামী সরকার এই প্রকল্প থেকে সরে আসে। চীনের সাথে সোনাদিয়াতে বন্দর নির্মাণের কথাবার্তা যেভাবে বাতিল হল হঠাৎই, সেই অভিজ্ঞতা মেলালে এটি সহজেই অনুমেয় যে, চীনকে পায়রা প্রকল্পেও বিনিয়োগের অনুমতি দেবেনা সরকার। আসলে পড়তে হবে “অনুমতি দিতে দেবেনা ভারত’!

সোনাদিয়াতে চীনের প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করার একই সময়ে যে ২ টি প্রকল্প সরকারের মূল আগ্রহের জায়গা হয়ে ওঠে তাঁর একটি হল পায়রা আর অন্যটি সোনাদিয়া থেকে মাত্র ২৫ কিমিঃ দূরে মাতারবাড়ি দ্বীপে কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প। পরেরটা হচ্ছে জাপানী বিনিয়োগে ।যে জাপান হচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ভারত এবং আমেরিকার চাপেই যে সোনাদিয়াতে চীনকে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে দেয়া হয়নি সেটি সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও স্বীকার করেছেন। কেন দেয়া হয়নি এটি পরিস্কার !

পাকিস্তানের গাদার,শ্রীলংকার হামবান্ততোতা সহ ভারত মহাসাগরে চীনের শিপিং লাইন আর এনার্জি ট্রান্সপোর্টেশনকে রক্ষা করার চীনের বিখ্যাত মুক্তোর ‘তাবিজ’ এর অংশ হতে পারতো বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্র বন্দর। চীনকে এইরকম একটি কৌশলগত অবস্থান সংহত করতে কেন দেবে ভারত? ভারতের তাবেদার আওয়ামী সরকারকে দিয়েই সোনাদিয়াতে চীনের প্রকল্প আটকে দেয়া হয়েছে এটি পরিস্কার। হাসিনা মনমোহন চুক্তির মধ্যে দিয়ে মংলা বন্দরে ভারত তাঁর অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। এখন পায়রাতে গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র পথে ভারত-মার্কিন-জাপানের অক্ষ একটি সংহত অবস্থান নিতে যাচ্ছে । এই অবস্থানের মানে হচ্ছে পরিস্কার!
আমাদের বঙ্গোপসাগর এখন আমাদের হাতে নেই। এটি এখন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজ সিন্ডিকেট বলয়ের হাতে চলে গেছে। ম্যাপের দিকে আরেকবার তাকালেই বোঝা যাবে আমাদের বঙ্গোপসাগরের মত আমাদের সুন্দরবনের পরিণতিও তাই হতে যাচ্ছে।

সুন্দরবন–সোনাদিয়া-মাতারবাড়ি-পায়রা নিয়ে এখানে যে ভু-রাজনৈতিক খেলা চলছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘Pivot to Asia’ এবং চীন ঘেরাও নীতির সাথে সমন্বয় রেখেই চলছে! দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এই খেলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খেলছে তার মিত্র জাপান এবং ভারতের সমন্বয়ে এই খেলায় বাংলাদেশ হল গোলামস্য গোলাম দুধভাত! ভারতের নির্দেশে ভারতের গোলাম সরকার ভারতের ‘Act east ‘ পলিসির সাথেই আছে! বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মাত্রা এই সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত থেকেই নির্ধারিত হবে- সে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদই হোক আর ধর্মীয় জঙ্গীবাদই হোক। যারা দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে এই সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাতের সাথে সম্পর্কহীন ব্যাপার হিসেবে বায়বীয় বিবেচনা করবেন তাঁরা হেইট্রেড স্পিচের পালে বাতাস লাগানো আর জল ঘোলা করা কাজকেই মদদ যোগাবেন। যা দিনশেষে গণশত্রুদের পরিকল্পিত নৈরাজ্য তৈরীর কাজকেই শক্তিশালী করবে। এখানে প্রাসঙ্গিক যে, সিপিবি গত বছর মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে হবে! সিপিবির এই বক্তব্যের সাথে উপরে আলোচিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি মেলালে বোঝা যাবে, সিপিবি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Pivot To Asia এবং ভারতের ‘Act East’ এশিয়ার নীতির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ স্টাইলে তাঁদের সুন্দরবন রক্ষার তথাকথিত লড়াই চালিয়ে যাবে।

সুন্দরবনকে রক্ষার সংগ্রাম একটি উচ্চতর রাজনৈতিক সংগ্রাম!শুধু অর্থনীতিবাদী সংগ্রাম করে সুন্দরবনকে বাঁচানো যাবেনা। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে, বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে, দক্ষিণ এশিয়াকে রক্ষা করতে হলে, গভীর জলের এই সকল হিংস্র মাছকে গভীর জলের ভেতরেই ধরতে হবে এবং চিহ্নিত করতে হবে। জল ঘোলা হওয়ার এই বিপদজনক সময়ে গণশত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শত্রু-মিত্র স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এই লড়াই যেমন ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ এবং তাঁদের গোলাম ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই তেমনি অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ঘিরে যে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধপরিকল্পনা চলছে, তার বিরুদ্ধেও লড়াই।

এই লড়াইয়ে জিততে হবে।! ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

লেখক: সামিউল আলম রিচি