আজকের মার্কসবাদীদের কর্তব্য

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন
ajkermarxbadi_anisraihan

এটা বড়ই দুর্ভাগ্যের যে, আমাদের দেশের মার্কসবাদী ও মার্কসবিরোধীদের আনুমানিক ৯৫ ভাগই মার্কস পড়েননি। তারা একদল শিখেছেন বিশ্লেষকদের কাছ থেকে, আরেকদল সমালোচকদের কাছ থেকে। মার্কস ও মার্কসবাদ না জেনেই তারা অনায়াসে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মার্কস দর্শনকে জগৎ পরিবর্তনের কাজে ব্যবহারের কথা বলেছেন এবং জগৎকে পরিবর্তনের নিয়মাবলীও তিনি আবিস্কার করেছেন। যারা জগৎটাকে বদলাতে চান, এটা তাদের একমাত্র হাতিয়ার। বিপরীতে ক্ষমতাসীন বুর্জোয়াদের হাতে আছে অর্থ, অস্ত্র, বিশেষজ্ঞ, সব কিছু। পরিবর্তনকামীরা এর বিরুদ্ধে কেবল আন্তরিকতা নিয়ে দাঁড়ালে কিছুই হবে না। পরিবর্তনের হাতিয়ার মার্কসবাদ আয়ত্ত্ব করা ও তা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কোনো বিকল্প নেই।

বুর্জোয়াশ্রেণী প্রমাণ করতে চায় যে সমাজতন্ত্র পরাজিত হয়েছে, মার্কসবাদ ভুল। যদিও আমরা দেখি সমাজতন্ত্র মোটেও পরাজিত হয়নি। যেখানেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানেই সমাজ মৌলিকভাবে এগিয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ সমাজে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানুষের অন্ধবিশ্বাস দূর হয়েছে। ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা লোপ পেয়েছে। আর মার্কসবাদ দিয়ে জগৎ যে পরিবর্তন করা সম্ভব তা তো বারবার প্রমাণীত হয়েছে।

এটা ঠিক যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। তার নিজের ভুল, অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে না পারা ও অব্যাহত ষড়যন্ত্রের কারণে। কিন্তু সমাজতন্ত্র যে পুঁজিবাদের সঙ্কটগুলো থেকে উত্তরণের উপায় এটা তো নিঃসন্দেহে প্রমাণীত। এখন সমাজতান্ত্রিক সমাজ নেই। কিন্তু পৃথিবীতে তবু এত যুদ্ধ কেন? এত মানুষ না খেয়ে মরছে কেন? এত বৈষম্য কেন? এত নৈরাজ্য, হিংসার ছড়াছড়ি কেন? পুঁজিবাদ প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে পরাজিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থা যে মানুষের সমস্যা সমাধানে সক্ষম নয়, তা বারবার প্রমাণীত হচ্ছে।

কিন্তু তারা তা স্বীকার করছে না। উল্টো বুর্জোয়াসমাজ তাদের ব্যর্থতা আড়াল করতে সারাক্ষণ সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দাবি করছে, এটাই ইতিহাসের সমাপ্তি, পুঁজিবাদই শেষ কথা। তারা এই খারাপকেই যেন মানুষ মেনে নেয়, যেন তারা সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন না দেখে এজন্য হেন কাজ নেই করছে না। মালিকানাপন্থী বুদ্ধিজীবীশ্রেণী তাদের হয়ে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তথা পুঁজিবাদের পক্ষে এই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ পুঁজিবাদ তাদের ভোগ দখলের সুযোগ দেয়। সমাজে অনেক মানুষ না খেয়ে থাকলেও তাদের মদের বোতলের যোগান নিশ্চিত করে। আর সমাজতন্ত্র বলে যতক্ষণ আরেকজন না খেয়ে থাকছে ততক্ষণ আপনার বিলাসের অধিকার নেই। আত্মকেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবীশ্রেণী তাই পুঁজিবাদকেই শ্রেয়জ্ঞান করছে। কারণ তারা মেনেই নিয়েছে কিছু মানুষ রাস্তায় থাকবে, খেতে পাবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজতান্ত্রিকরা তা মেনে নেয়নি।

প্রশ্ন উঠবে, এত ইতিবাচকতা সত্ত্বেও কেন মার্কসবাদীরা এগুতে পারছে না। প্রথমেই তার ইঙ্গিত করেছি। মার্কসবাদী দাবীদাররা তাদের লড়াইয়ের হাতিয়ারটাকে ঠিকমতো আয়ত্ত্বে নিতে পারছে না। বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে বৈশ্বিক রণনীতি, জাতীয় রণনীতি তৈরি করতে পারছে না। আবার শোষকরা এতই প্রতিক্রিয়াশীল ও ফ্যাসিস্ট হয়েছে যে, মার্কসবাদের প্রথম যুগে সংগ্রামের যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ হয়েছিল, তা এখন আর কাজ করছে না। সাধারণ গণতান্ত্রিক দাবী-দাওয়াতেও নেমে আসছে গুলি। এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলার জন্য লড়াইয়ের যে লাইন চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে, পুরনো কর্ম ও চিন্তাপদ্ধতিতে আটকে থাকা ও কোথাও কোথাও সুবিধাবাদ, জাতীয়তাবাদ, উদারতাবাদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ফলে (তাও ঘটছে মার্কসবাদ না আয়ত্ত্ব করতে পারার ফলেই) পার্টিগুলো নতুন যুগের লড়াইয়ের এই লাইন বিকশিত-আয়ত্ত্ব করতে ও আজকের প্রেক্ষাপটে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙতে না পেরে, তাদের একাংশ হতাশ হচ্ছে এবং তারা বুর্জোয়াদের 'সমাজতন্ত্র পরাজিত' তত্ত্বের প্রচারণায় ঘায়েল হচ্ছে, সেদিকেই হেলে পড়ছে। এর কারণটা হচ্ছে মার্কসবাদ থেকে আসলে তারা কিছুই শেখেনি। মার্কসবাদকে আমরা যদি আঁকড়ে ধরতে পারি, বিশেষত ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাটা যদি আমরা আয়ত্ত্ব করতে পারি, বুর্জোয়াদের মতো আজকের যুক্তি দিয়ে অতীতের ইতিহাস বিশ্লেষণের পদ্ধতি ত্যাগ করে বস্তুগতভাবে বিরাজমান পরিস্থিতিকে উন্মোচন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারি, তাহলে এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলার রাস্তা খুলে যাবে।

সেজন্য মার্কস অধ্যয়ন, মার্কসীয় দর্শন আয়ত্ত্ব করাটা আজ খুবই জরুরী। পার্টির লাইন আছে, তাই কাজ করে গেলেই হবে, এ ধারণা দিয়ে আজ আর এগুনো যে যাচ্ছে না, তা তো প্রমাণীতই। পাশাপাশি পরিবর্তনকামী মার্কস সমালোচকরাও যদি একটু দায়িত্বশীল ও নীতিনিষ্ঠ হয়ে মার্কস জেনে সমালোচনার উদ্যোগ নিতেন, তাহলে তারা অন্তত বুর্জোয়া প্রচারের গাড্ডায় ভেসে যেতেন না।

সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের সংগ্রাম থামবে না। যতদিন পুঁজিবাদ আছে, ততদিন শোষণ-বৈষম্য ও নৈরাজ্য আছে। একই কারণে ততদিন মানুষ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের সংগ্রাম, শোষণহীন এক পরিকল্পিত সমাজ ব্যবস্থার সংগ্রাম চালিয়েই যাবে। তা হয়তো কখনও দুর্বল হবে, কখনও এগিয়ে যাবে। কিন্তু এই সংগ্রাম থামার নয়।

তবে আরেকটু যোগ করা দরকার যে, আদর্শিক শক্তির উৎসটা দর্শনের গভীরে। সেখানে আপস করে সংগ্রাম দাঁড় করানো যায় না। মার্কসীয় আদর্শের মর্মবস্তুই হচ্ছে, এটা প্রোলেতারিয়েতের যুগ। এ যুগে তারা ছাড়া আর কারো পক্ষে প্রগতিশীল হওয়া সম্ভব না। আর প্রোলেতারিয়েতের সংগ্রামের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাই নতুন সমাজ গড়ার পথনির্দেশক। আদর্শের এই মৌলিক চলককে এড়িয়ে গেলে তাৎক্ষণিক কিছু সুবিধা মিলতে পারে, কিন্তু এই আপস শেষ পর্যন্ত আদর্শহীনতার দিকেই যাবে। এভাবেই মার্কসবাদ থেকে সরে এসে কল্যাণকামী সমাজতন্ত্র হয়, তারপর তা আরো সরতে সরতে বুর্জোয়া হয়ে যায়।

সংগ্রামের পথটা উঁচু-নিচু। আজ সারা পৃথিবীতেই গণস্বার্থের প্রশ্নে আন্দোলন স্তব্ধ। শুধু মার্কসবাদী নয়, আরো অনেকেই তো আছে। কেউই এগুচ্ছে না। ইতিহাসে এরকম সময় আসে, মানুষ তা ভেঙে বেরও হয়। কিন্তু এরকম সময় দরকার আরো আদর্শনিষ্ঠতা।

যে উত্তরাধিকার আমরা বহন করি : “শ্রেণী সমঝোতার ওকালতি করা; সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণা এবং সংগ্রামের বিপ্লবী পদ্ধতি পরিত্যাগ করা; বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া; জাতীয়তা ও দেশের সীমানাগুলো যে ঐতিহাসিকভাবে ক্ষণস্থায়ী এই সত্য নজর থেকে সরে যাওয়া; বুর্জোয়া বৈধতাকে পূজনীয় করে তোলা; ‘জনগণের ব্যাপক অংশ’ (মানে পেটিবুর্জোয়া)-এর বিরূপ হয়ে ওঠার ভয়ে শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণী সংগ্রামকে বর্জন করা– নিঃসন্দেহে এগুলো হলো সুবিধাবাদের মতাদর্শগত ভিত্তি।’’ – ভি. আই. লেনিন। রচনা সংকলন। খন্ড ২১। পৃষ্ঠা ৩৫-৪১। ইংরেজী সংস্করণ। প্রগতি প্রকাশন, ১৯৭৪।

জয় সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ।

লেখক: আনিস রায়হান