একজন আজীবন কমিউনিস্ট - কমরেড সরোজ দত্ত

খোলা কলাম: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০১৬, ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন
soroj_pc

আসাদুজ্জামান আল মুন্না

ভারতবর্ষের সামন্তবাদবিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং শ্রমিকশ্রেণী- কৃষকশ্রেণী ও অপরাপর মিত্র শক্তি নিয়ে বিপ্লবী সংগ্রামের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় যে কমিউনিস্ট সংগ্রাম গড়ে ওঠে, তা মূলত পরিপক্ক হয়ে ওঠে গত শতকের ৬০ এর দশকে। বিশেষ করে বললে ৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই পরিপক্কতা তৈরি হয়, যখন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা সংশোধনবাদী চিন্তাকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাজির করেন ভারতীয় বিপ্লবের স্তর, সঠিকভাবে চিহ্নিত করেন বিপ্লবের শত্রু- মিত্রদের ও বিপ্লবকে সফল করার পথ হাজির করেন এবং দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের রাজনীতিকে উর্ধ্বে তুলে ধরে ভা্তবর্ষের বিপ্লবে এক ঐতিহাসিক ভুমিকা পালন করেন। যদিও ভারতবর্ষে সংশোধনবাদ এবং বিপ্লবী মার্কসবাদের মধ্যে সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু নকশালবাড়ি আন্দোলনই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে সংশোধনবাদ এবং বিপ্লবী মার্কসবাদের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা টানতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে নকশালবাড়ি থেকে গোটা ভারতবর্ষে। সংশোধনবাদ ও বিপ্লবী মার্কসবাদের দীর্ঘদিনের এই সংগ্রামের ফলে যে উল্লম্ফন ঘটে নকশালবাড়ি আন্দোলনের মধ্যে তাঁর তাত্ত্বিক মাল- মশলা জুটিয়েছিল মূলত মাও সেতুং চিন্তাধারা(যা এখন মাওবাদ নামে পরিচিত), যা মার্কসবাদ- লেনিনবাদকে বুর্জোয়াশ্রেণী ও সংশোধনবাদসহ প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর হাত থেকে শুধুমাত্র রক্ষায় করে নি, তাঁকে বিকশিত করেছে এক অনন্য উচ্চতায়। নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি সিপিআই(এম-এল)। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে ভারতের বিপ্লব স্তিমিত হয়ে পড়ে।

আমরা জানি বিশ্বজগতের কোন কিছুই খুব সরলপথে এগোয় না, সমাজবিপ্লবের ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাপক ধর পাকড়, অত্যাচার, হত্যা, নেতৃত্বকে হত্যা- গুম ইত্যাদি এবং পার্টির অন্তর্কোন্দল ও কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সাময়িকভাবে বিপ্লবী আন্দোলন পিছু হটে। তবে সেই আন্দোলন এখন আবারো প্রাণ পেয়েছে। ভারত নামক পৃথিবীর বৃহত্তম গনতান্ত্রিক নামের বাস্তবে চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রকে ভাঙ্গার প্রত্যয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন নকশালবাড়ির উত্তরসুরীরা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যাদের আভ্যন্তরীন নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে আজকের এই বিপ্লবীরা আর নকশাল নামে সেভাবে পরিচিত নন, এখন তাঁরা মাওবাদী নামেই অধিক পরিচিত। ভারতের বিস্তৃত এলাকা বিশেষত ছত্তিশগড়, উড়িষ্যা, বিহাড়, অন্ধ্র প্রদেশ, আসামসহ প্রায় ২০ টি রাজ্যে রয়েছে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি, শক্ত জনভিত্তি, প্রভাবিত এলাকা, মুক্তাঞ্চল, ঘাটি এলাকা্সহ বিভিন্ন মাত্রার রাজনৈতিক কার্যক্রম। আর তাদের দমনে পুলিশ, বিএসএফ, কোবরা, সিআরপিএফ, স্কপিয়ন , দলীয় গুন্ডাবাহিনীসহ সব সশস্ত্র বাহিনী নিয়োজিত এবং স্পেশাল বাহিনী তৈরি করা হয়েছে অপারেশন গ্রীন হান্টের অধীনে, যার প্রথম দুটি পর্যায় শেষ হওয়ার পর তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে রক্তপিপাসু মোদির আমলে। ষাটের দশকের সেই অগ্নিঝরা উত্তাল দিনগুলোর আলোচনা কিংবা নয়া গনতান্ত্রিক বিপ্লবের উত্থানের যুগের সেই সময়ের আলোচনায় যে ক’টি নাম সর্বাগ্রে চলে আসে তাঁর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন কমরেড সরোজ দত্ত। যতদিন পর্যন্ত শোষিত জনগণের মুক্তি নিশ্চিত না হবে ততদিন পর্যন্ত বিদ্রোহ চলতে থাকবে, আর সরোজ দত্ত বেঁচে থাকবেন সেইসব বিদ্রোহী- মুক্তিপাগল মানুষের মননে গভীর অনুপ্রেরণা হয়ে।

কমরেড সরোজ দত্ত নকশাল বাড়ির আন্দোলনে যোগ দেন ১৯৬৭ সালে। কমরেড সরোজ দত্ত ছিলেন নকশাল বাড়ি আন্দোলনের রুপকার কমরেড চারু মজুমদারের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা এবং সি পি আই(এম-এল) এর সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য। একই বছরে তিনি পার্টি পত্রিকা ‘দেশব্রতীর’সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য মনোনীত হন এবং ‘শশাংক’নামে লেখা শুরু করেন। আমাদের আলোচনার পরিধি এই আজীবন বিপ্লবী কমরেড সরোজ দত্তকে নিয়ে।

কমঃ সরোজ দত্ত চাইলে অনেক কিছুই হতে পারতেন এবং যা হতে চাইতেন তাতেই তিনি সফলকাম হতেন। তিনি শুধু কবিতা লিখলে অনেক বড় কবি হতেন, সাহিত্য চর্চা করলে অনেক বড় সাহিত্যিক হতে পারতেন, অনুবাদ কর্মে তিনি তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন, সাংবাদিকতায় তার মেধার পরিচয় পাওয়া গেছে, চাইলে মার্কসবাদি তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবিও হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেসব কিছুই হতে চান নি। যদিও এসব কাজে তাঁর অংশগ্রহন ছিল কিন্তু সেগুলোর পেছনেও ছিল একটি মাত্র লক্ষ্য, আর সেটি হচ্ছে শোষিত জনগণের মুক্তি। তিনি জনগণকে ভালোবেসেছেন, তাই বিপ্লবী হতে চেয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন- শ্রেণী বিভক্ত সমাজে একমাত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই জনগণের সেবা করা যায়। এবং শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে তিনি একজন মহান বিপ্লবী হয়ে বীর হিসেবেই মৃত্যু বরণ করেছেন। সারাটি জীবন তিনি ব্যয় করেছেন বিপ্লবের পেছনে, শোষিত শ্রমিক- কৃষকের মুক্তির পেছনে।

মাও সেতুং বলেছিলেন, “একটা ভালো কাজ করা কারো পক্ষেই কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে সারাজীবন ধরে ভালো কাজ করা, কখনো কোন খারাপ কাজ না করা, সর্বদা ব্যাপক জনসাধারণ, যুবক বিপ্লবের জন্য হিতকর হওয়া, কয়েক দশক বছর ধরে একটানা কঠোর সংগ্রাম করা- এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ”। সারা জীবন ধরে তিনি এই কঠোর সংগ্রাম করেছেন এবং আজীবন কমিউনিস্ট ছিলেন। এ প্রসঙে কমঃ চারু মজুমদার বলেন- “কমরেড সরোজ দত্ত এই রকমই একজন্ কমরেড যার সারাটা জীবন বিপ্লবের কাজে ব্যায়িত হয়েছে, তাঁর ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় করতো না, এমন কোন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি নেই। তাই পুলিশবাহিনী বিচারের প্রহসন পর্যন্ত করার সাহস পেলো না, সেই রাত্রেই তাঁকে হত্যা করলো।”

কমরেড সরোজ দত্তের বিপ্লবী জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের রুপকার কমরেড চারু মজুমদার আরও বলেন- “কমরেড সরোজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতোই তিনি বীরের মৃত্যু বরন করেছেন। তাঁর বিপ্লবী নিষ্ঠা এক আদর্শ হিসেবে তরুনদের গ্রহন করতে হবে।” চারু মজুমদারের এই মূল্যায়ন নিছক আবেগের বশে ভাবালুতা নয়, ভারত ও বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশে যারাই বিপ্লবী আন্দোলন- সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন, প্রচলিত শোষনমুলক রাষ্ট্রব্যাবস্থা ভাঙ্গার প্রত্যয় গ্রহন করে সংগ্রামে ব্রত হবেন, সরোজ দত্ত তাদের সামনে এক বিপ্লবী আদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হবেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কমরেড মাও সেতুং বলেছিলন- “যদি একবার হারো, বারবার লড়ো- যতদিন না বিজয়ী হও”। এই ছোট কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হল এই যে, বিপ্লব হল এক অব্যাহত নিরন্তর অনুশীলন এবং শেষ পর্যন্ত সর্বহারার জয় অবশ্যম্ভাবী। তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মহুর্ত পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন নিরন্তর বিপ্লব প্রয়াসের পরতে পরতে।

নবারুন ভট্টাচার্য সরোজ দত্তকে তুলনা করেছেন জুলিয়াস ফুচিক এবং গ্যাব্রিয়েল পেরির সংগে। তিনি লিখেছেন- “ইতিহাসে দেখা গেছে সরফরাজি চন্ড ও ভন্ডদের দাপটের সামনে অনেকেই ক্লীব, পঙ্গু ও অসাড় হয়ে পড়ে। মানুষ যত চুপ করে থাকে, যত অন্যায় মেনে নেয় তত বাড়তে থাকে রাক্ষসদের হম্বি তম্বি ও রাক্ষসদের কর্তাভজা খোক্কসদের বিকট কোরাস। এই অসময়ে যারা লালকমল নীলকমল হতে চাইবে তাদের বিবেক সবল ও তরতাজা থাকা দরকার। কোন কোন মানুষের কথা ভাবলে কাজটা করে ফেলা অসম্ভব নয়। সেরকমই একজন মানুষ ছিলেন কমরেড সরোজ দত্ত। নিজের জীবন দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন জুলিয়াস ফুচিক বা গ্যাব্রিয়েল পেরির পাশে”।

অনেকেই সমালোচনা করেন সরোজ দত্তের লেখাগুলি একদিকে ঝুঁকে ছিল। হ্যা, ছিলই তো। তিনি নিজেই তো আমৃত্যু ঝুঁকে ছিলেন শুধুমাত্র একটি দিকে। শোষণহীন সমাজ গড়ার দিকে, শ্রমিক- কৃষক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির পথের দিকে। এজন্য তাঁর কখনো পক্ষ বেছে নিতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় নি। কবি- সাংবাদিক- আন্দোলনকর্মী- সাহিত্যসমালোচক- বুদ্ধিজীবি- রাজনীতিবিদ- স্বমী- ভাই- বাবা- বন্ধু ইত্যাদি বহুমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যে সরোজ দত্ত আসলে একজনই- যিনি লিখেছেন-

“কবিতা শ্লোগান হয়ে উঠছে বলে

দুঃখ করছো

যদিও শ্লোগান কবিতা হয়ে উঠছে না দেখে

দুঃখ করো নি

আমার দুঃখ এইখানেই।”

কমরেড সরোজ দত্ত অনেকের কাছে শুধুমাত্র কবি সরোজ দত্ত হিসেবে পরিচিত। তিনি অসাধারণ অনেক কবিতা লিখেছেন, কিন্তু তাই বলে তাঁর পরিচিতি কবি হওয়াটা মোটেও কাম্য নয়। তাঁর একমাত্র পরিচয় তিনি একজন আজীবন বিপ্লবী, কমিউনিস্ট বিপ্লবী। তাঁকে কবি হিসেবে সামনে নিয়ে আসার পেছনে কতটুকু রাজনীতি আছে তা নিশ্চয়ই অনুসন্ধানের দাবি রাখে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মার্কসবাদী লেখক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য উল্লেখ্য করছি। তিনি বলেছিলেন- “কবি এবং বুদ্ধিজীবিরা সভা সমিতি করে কবি সরোজ দত্তকে নিয়ে আসর মাতানোর চেষ্টা করছে। বিপ্লবী সরোজ দত্তের গায়ে ভদ্দরলোক কবির আলখাল্লা চাপাবার ব্যার্থ প্রচেষ্টায় রয়েছে। এই সব সর্বজনবিদিত পন্ডিতেরা কি সর্বজনবিদিত সত্যকেও ভুলে গেছেন- কবিমাত্রই বিপ্লবী নন, কিন্তু প্রতিটি বিপ্লবীই কবি। বিশ্বের সুন্দরতম- মধুরতম কবিতার জন্ম দেওয়ার জন্যে তাঁরা জীবন দিয়েছেন, জীবন দিয়ে চলেছেন। কমরেড সরোজ দত্ত বিপ্লবী, তাই কবি।” তাঁর কবিতা নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। দুটি কবিতা নিচে তুলে দিচ্ছি-

শকুন্তলা

দুর্বাসার অভিশাপ, অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী

স্বর্গমিলনের দৃশ্য, মিথ্যা কথা হীন প্রবঞ্চনা-

রাজার লালসা-যূপে অসংখ্যের এক নারীমেধ

দৈবেঁর চক্রান্ত বলি রাজ কবি করেছে রটনা।

গৃহস্বামী দেশান্তরে, অরক্ষিত দরিদ্রের ঘরে

নারী মাংস লোভে রাজা মৃগমাংস এল পরিহরি-

অরুচি হয়েছে যার অবিশ্রাম নাগরী বিহারে

তাহার কথার ফাঁদে ধরা দিল অরণ্য- কিশোরী।

স্তব্ধ আজি নাট্যশালা, নান্দীমুখ আতঙ্কে নির্বাক

বিদীর্ন কাব্যের মেঘ, সত্য সুর্য উঠেছে অম্বরে-

দর্শক শিহরি করে নাটিকার মর্মক থাপাঠ,

‘বালিকা গর্ভিণী হল লম্পটের কপট আদরে’-

রাজার প্রসাদভোজী রাজকবি রচে নাট্যকলা,

অন্ধকার রঙ্গভূমি, ভূলুন্ঠিতা কাঁদে শকুন্তলা।

 

কোন বিপ্লবী কবির মর্মকথা

আমার কবিতা কভু কহিবেনা আমার কাহিনী,

অসতর্ক কোন ছত্রে ধ্বনিবেনা ক্রন্দন আমার,

আমার কবিতা নহে দুর্বলের দুঃখের বেসাতি,

নহে সে অপুর্ণকাম অক্ষমের মর্মব্যাভিচার।

এ নহে সমষ্টিপ্রেম স্বার্থপর স্বতন্ত্রবাদীর,

আনিনি শক্তির পায়ে অশক্তের শঙ্কিত প্রণামী,

গণগগনের পথে অগ্নিরথ জনমানবের

যাহারা টানিয়ে আনে তাহদের সহকর্মী আমি।

আমার পাবে না দেখা আমার কাব্যের পৃষ্ঠপটে,

সেথায় আমার সীমা অসীমে বিলীন,

বিষপক্ষে তন্দ্রাহত রক্তস্রোত শৈবাল দীঘিরে,

বাহিরের বন্যাজলে করিয়াছি দিকচিহ্নহীন।

কবরে প্রেতিনী হয়ে কাঁদিবেনা আমার বেদনা,

দুঃসাহসী বিন্দু আমি, বুকে বহি সিন্ধুর চেতনা।

শুনিনি তাদের কথা, গালি দিনু ইতর ভাষায়।

ফসল বুনিয়া তারা ক্লান্তিতে ঝরিয়া পড়ে আজ

হাসিয়া প্রস্তুত আমি সে ফসল তোলার আশায়।

কমরেড সরোজ দত্ত জন্মগ্রহন করেছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমায়। বাবা হৃদয়কৃষ্ণ এবং মা কিরন কুমারীর তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বরাবরই মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৩০ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলিজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক এবং ১৯৩৩ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাশ করেন। কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি. এ পাশ করেন ১৯৩৬ সালে। স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্র ফেডারেশন সংগঠনটি তিনিই গড়ে তুলেছিলেন। সেসময় তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন।

যে কোন মানুষের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ- প্রতিবেশ অনেক বড় ভুমিকা পালন করে। কমঃ সরোজ দত্তের বেড়ে ওঠা প্রসঙ্গে তাঁর কাছ থেকেই শোনা তরুন সান্যালের কথাগুলো উদ্ধৃতি করছি- “নোয়াম চমস্কি একটির রচনায় বলেছিলেন- ‘শৈশব থেকে মানুষ যে পরিবেশে, প্রকৃতি প্রভৃতির সহচর্যে বড় হয় তার ছাপ সারা জীবন থাকে।’যশোর জেলার নড়াইল অঞ্চলের প্রকৃতিতে ছিল ঝর বৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আবার শান্ত সমাহিত। প্রকৃতির এই বৈচিত্রময় স্বচ্ছন্দ আবর্তন ঋতুতে ঋতুতে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছিল তাঁর ওপরে। খুলনা জেলায় ১৯৪২ সালে সরোজদার নেতা বিষ্টু চ্যাটার্জী এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তখন নাৎসিদের বিরুদ্ধে লালফৌজ অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করছে। খুলনা- যশোরে ভদ্রা নদীর বাধটি ভেঙ্গে যায়। যশোর খুলনার দিকে হাজার হাজার বিঘে চাষের জমিতে নোনাজল ঢুকে পড়ে। সেই সময় লাল বিক্রম মনে করিয়ে দিয়ে বিষ্টু চ্যাটার্জী যিনি কংগ্রেস থেকে কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, তিনি চাষী ও চাষী বউদের সমাবেশিত করে সরকার যে বাঁধ সারাতে ছয় মাস লাগবে বলেছিল, তা একরাতে সারিয়েছিলেন। সরোজ দত্ত ছিলেন ঐ অঞ্চলের মানুষ ও তখন ছাত্র ফেডারেশনের বিশিষ্ট কর্মী”। খুলনা আঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভয়ংকর রুপ নিয়ে হাজির হলে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিতে পারে আবার স্বাভাবিক শান্ত- মনোরম পরিবেশ মনকে পুলকিত করে তোলে। তেমনি কমঃ সরোজ দত্তের চরিত্রের মধ্যেও ছিল এই দুটি বৈশিষ্টের অদ্ভুত মিল। তার ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় করত না এমন কোন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ছিল না সেসময়। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেটা মার্কসবাদের নামে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সংশোধনবাদী হোক আর রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের দালালী করা সুবিধাভোগী হোক সবার কাছে সরোজ দত্ত ছিল একটি ত্রাসের নাম, এটা তার লেখা দেখলেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এজন্যই হয়তো প্রতিক্রিয়াশীল ভারত রাষ্ট্রটি তাঁর বিচারের প্রহসন করার মত সাহস পর্যন্ত রাখতে পারে নি। একদিকে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে ত্রাস হলেও মানুষকে ভালবাসতেন। আর এই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ তাঁকে নিয়ে গেছে এক সুমহান উচ্চতায়। মানুষের প্রতি এই গভীর ভালবাসাই মূলত তাঁর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তীব্র ত্রাস হয়ে ওঠার কারন। মানুষকে ভালোবাসতেন বলেই মানুষের মুক্তির পথে বাধা কোন কিছুকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেন নি, ঘৃণা করেছেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। খুলে দিয়েছেন তাদের ভালো মানুষের পরে থাকা মহত্বের মুখোশটি। মুছে ফেলা ইতিহাসকে নতুনভাবে উন্মোচন করেছেন আমাদের সামনে।

১৯৩৮ সালে কমরেড সরোজ দত্ত ‘অগ্রণী’ ও ‘অরণি’ পত্রিকাতে কবি ও মার্কসবাদী সাহিত্যিক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এর মধ্যে তিনি জেলেও অন্তরীত হয়েছিলেন। এরপর ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে প্রথম বিভাগে এম. এ পাশ করেন। এমএ পাশ করার পর তিনি যোগ দেন প্রগতি লেখক সঙ্ঘে।

এ বছর আহুতোশ কলেজ হলে প্রগতি লেখক সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে কবি বুদ্ধদেব বসু এবং সমর সেন যথাক্রমে ‘Bengali Literature Today: Position of Modern Writers’ এবং ‘In Defense of Decadents’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ রচনা পাঠ করেন। সরোজ দত্ত ‘অগ্রণী’ পত্রিকার পাতায় রচনা দুটির জবাব দেন যথাক্রমে ‘ছিন্ন করো ছদ্মবেশ’ এবং ‘অতি আধুনিক বাংলা কবিতা’ শিরোনামে। মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরণের সাহিত্য সমালোচনা এর আগে বা পরে কখনো হয়েছে বলে আমার জানা নেই। প্রবন্ধ দুটিতে তিনি প্রগতিশীলতার খোলসে ধেয়ে আসা বুর্জোয়া এলিয়টিজমের কড়া সমালোচনা করেন। সমর সেনের সাথে এই বাগ- বিতন্ডা অনেকদূর গড়ায়। সরোজ দত্তের প্রথম সমালোচনা প্রবন্ধ প্রকাশের পর সমর সেন একটি জবাব দিলে সরোজ দত্ত ‘প্রতুত্তর’ শিরোনামে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন জবাবের বিপরীতে। সমর সেন তারপর আর তার কোন জবাব দেন নি। অনেক পরে অর্থাৎ সরোজ দত্তকে রাষ্ট্র খুন করে ফেলার পর সমর সেনের ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘বাবু বৃত্তান্ত’ গ্রন্থে ‘উড়ো খই’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে লিখেছেন- “বহুদিন পরে লেখাটি পড়ে মনে হল সরোজ দত্ত ঠিক লিখেছিলেন”। সমালোচনা প্রবন্ধ দুটি পাঠ করলে সরোজ দত্তের শিল্প- সাহিত্য সম্পর্কে ধ্যান- ধারণার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। যে দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাই তাঁর কবিতায়, লেখনীতে এবং বর্ণাঢ্য বিপ্লবী জীবনের পরতে পরতে। সমর সেন তাঁর ‘In Defense of Decadents’ (অবক্ষয়বাদীদের সমর্থনে) প্রবন্ধে অনেক কথা খরচ করে ঘুরিয়ে পেচিয়ে উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের প্রশ্নকে সামনে রেখে যেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তার সারকথা হল- যেহেতু পুজিবাদী সমাজে অবক্ষয় বিষয়টা একটা সামগ্রিক বাস্তবতা, সেহেতু এই অবক্ষয়কে সমালোচনা বা তিরস্কার না করে শুধুমাত্র চিত্রিত করাটাই প্রগতিশীলতা। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তিনি টেনে নিয়ে আসেন এলিয়টকে। কিন্তু সরোজ দত্ত এই এলিয়টিয় মতামতকে মেনে নিতে পারেন নি। তিনি এই বিতর্কে শুধু সমর সেন কিংবা এই ধারাকে কুপোকাতই করেন নি, আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন- শিল্প- সাহিত্যের ভেতরকার রাজনীতিকে।

কমরেড সরোজ দত্ত বেশ কিছু অসাধারণ অনুবাদ কর্ম সম্পাদন করেছেন। যা তাঁর অনুবাদ কর্মে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর বহন করে, যদিও তাঁর বিপ্লবী জীবনের কাছে এগুলো কোন পরিচয়ই হতে পারে না। তিনি ১৯৪০ সালে ইংরেজি দৈনিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকায়’ সহ সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ‘র্যো মা রোলা’র আত্মজীবনী ‘I will not rest’ , ১৯৪৭ সালে ‘স্ক্রুপসকায়ার’- এর লেখা ‘Memoirs of Lenin’, ১৯৫৪ সালে ম্যাক্সিম গোর্কীর ‘Literature & Pamphlets’, ১৯৫৬ সালে ‘লিও টলস্টয়’ এর উপন্যাস ‘Tale of Sebastopol’ এবং ১৯৫৭ সালে ‘তুর্গেনিভ’ এর উপন্যাস ‘Spring Torrent’ ও ‘লিও টলস্টয়’ এর উপন্যাস ‘Resurrections’ বাংলায় অনুবাদ করেন যথাক্রমে ‘শিল্পীর নবজন্ম’, ‘লেনিনের স্মৃতি’, ‘নানা লেখা’, ‘সেবাসতোপোলের কাহিনী’, ‘বসন্ত প্লাবন’ এবং ‘পুনরুজ্জীবন’ নামে।

কমরেড সরোজ দত্ত ১৯৪৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর বিয়ে হয় কমিউনিস্ট কর্মী কমরেড বেলা বোসের সঙ্গে।নিই। কমঃ বেলা দত্ত ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের একজন সক্রিয় নারী কর্মী। বিয়ের আগেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মেমবার হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও সরোজ দত্ত তখন পর্যন্ত পার্টির মেমবার হন নি। বেলা দত্তের ভাষ্যমতে সরোজ দত্ত এটা নিয়ে খুব গর্ব করতেন এই বলে যে তাঁর স্ত্রী কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। বিয়ের পর পরই বেলা দত্ত গ্রামে চলে যান তেভাগা আন্দোলনে যোগ দিতে। পার্টির সিদ্ধান্তে তিনি হাওড়া জেলায় গিয়ে কাজ করেন। বিয়ের পর পরই তাঁর এই চলে যাওয়া সরোজ দত্ত কিভাবে নিয়েছিলেন তা একটি স্বাক্ষাতকার থেকে বেলা দত্তের বক্তব্য উদ্ধৃতি করছি- “সরোজ দত্ত ভীষন খুশি হয়েছিল, আমার গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্তে। ও এ ব্যাপারে খুব উৎসাহ দিত। ওইতো আমাকে একটা ছোট্ট টিনের সুটকেশ গুছিয়ে দিয়ে হাওড়া ময়দান স্টেশন থেকে ছোট মিটার গ্যাজের ট্রেনে তুলে দিয়ে এলো।” বিপ্লবী সরোজ দত্তের সংগ্রামী জীবনের সারাজীবনের সঙ্গী ছিলেন কমঃ বেলা দত্ত।

১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘পরিচয়’ ও ‘স্বাধীনতায়’ যুক্ত হন কমঃ সরোজ দত্ত। পরিচয়ের সম্পাদনার দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁকে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতায় সম্পাদক মন্ডলীতে যোগ দেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬২সালেচীন- ভারত যুদ্ধের সময় পি. এ্যক্ট এ গ্রেফতার হয়ে দমদম জেলে কারাবাস করেন ১৪ মাস। এর মধ্যে ১৯৬৪ কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। নতুন নামকরনে গঠিত সি পি আই(এম) জেল থেকে বেরিয়ে কমঃ সরোজ দত্ত যোগ দেন নতুন গঠিত সিপিআই(এম) এ এবং পার্টি পত্রিকা ‘দেশহিতৈষী’ সম্পাদকমন্ডলীরসদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। এই পত্রিকাতেই ‘শশাংক’ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৭ সালেনকশালবাড়ি আন্দোলন শুরু হলে তিনি যোগ দেন নকশালবাড়ির আন্দোলনে। এরপর শুরু হয় তাঁর বিপ্লবী আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন।

১৯৭২ সালের ৫ই আগষ্ট রাতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। শেষ রাতে তাঁকে হত্যা করে মাথা কেটে লোপাট করে দেয়া হয়। রাষ্ট্রের নথিতে তিনি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

কমরেড সরোজ দত্ত তাঁর একটি কবিতায় লিখেছিলেন- কাব্যের পৃষ্ঠপটে তাঁর দেখা পাওয়া যাবে না, সেখানে তাঁর সীমা অসীমে বিলীন হয়ে গেছে। বিপ্লবের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য জীবন দিয়ে তিনি সেটা প্রমাণ কররেছেন। তিনি লিখেছিলেন- “মুর্তি ভাঙা হচ্ছে শুধু মুর্তি ভাঙার জন্য নয়, পাল্টা মুর্তি গড়ার তাগিদে”। সরোজ দত্ত ভেঙ্গেছেন, অনেক কিছুই ভেঙ্গেছেন। পুরনো সংস্কৃতি, মান্য করে চলার সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিন্যাসে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের স্বার্থের ঐতিহ্য, ইতিহাসের অচলায়তন, শাস্ত্রীয় প্রতিষ্ঠিত সত্য এমন অনেক কিছুই তিনি ভেঙ্গেছেন। আর তাঁর এই ভাঙ্গার পেছনে কারন তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার ফলে সৃষ্ট শ্রেণী ঘৃণার প্রকাশ তাঁর লেখায় ও কর্মে অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের রুপকার কমঃ চারু মজুমদার সরোজ দত্ত খুন হওয়ার পরে বলেছিলেন- “কমরেড সরোজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতোই তিনি বীরের মৃত্যু বরন করেছেন। তাঁর বিপ্লবী নিষ্ঠা এক আদর্শ হিসেবে তরুনদের গ্রহন করতে হবে।” চারু মজুমদারের এই মূল্যায়ন নিছক আবেগের বশে ভাবালুতা নয়, ভারত ও বাংলাদেশে যারাই বিপ্লবী আন্দোলন- সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন, প্রচলিত শোষনমুলক রাষ্ট্রব্যাবস্থা ভাঙ্গার প্রত্যয় গ্রহন করে সংগ্রামে ব্রত হবেন, সরোজ দত্ত তাদের সামনে এক বিপ্লবী আদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হবেন। এর ব্যত্যয়

ঘটার কোনো সুযোগ নাই।